Monday, November 13, 2017

ইসলাম এবং কমিউনিজমের সম্পর্ক ও বৈপরিত্ব


কমিউনিজম স্রষ্টার অস্তিত্ব, ওহী ও আখেরাতকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। কমিউনিজমের সাথে যে কোন ধর্মের সহাবস্থান অসম্ভব হওয়ার মৌলিক কারণ এটাই।

কমিউনিজমের কিছু নীতি আছে। সে সব নীতির উপর ভর করে কমিউনিস্টরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে থাকে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেঃ
১ ব্যক্তিকে শ্রেণি সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা
২ পরিবার প্রথাকে ধ্বংস করে দিয়ে শ্রেণি সংগ্রামকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ আকারে তুলে ধরা
৩ মানবিক নীতির একক সত্তা অস্বীকার করে দল ও রাষ্ট্রের সুবিধামত তার ব্যাখ্যা প্রদান করা

প্রত্যেকটি সমাজ ব্যবস্থাতেই নীতির রূপায়ণের ক্ষেত্রে পন্থা বা মানহাজ আপেক্ষিক হতে বাধ্য। এই প্রয়োজনের দিকে লক্ষ করেই ইসলাম ইজতেহাদ ও কিয়াসের সুযোগ রেখেছে। কিন্তু কমিউনিজম নৈতিক এই ভিত্তিটাকে এতটাই আপেক্ষিক পর্যায়ে টেনেছে যে এর ফলে নৈতিক নৈরাজ্যের জন্ম হয়েছে।

শ্রমিকদের অর্থনৈতিক মুক্তিসাধনের প্রতিশ্রুতিকে পুজি করে আধুনিক কমিউনিজমের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু শেষে দেখা গেল অর্থনৈতিক চিন্তাধারার যেই বস্তুবাদী ভিত্তি তারা প্রতিষ্ঠা করেছে সেটাকেই জীবনের সামগ্রিক একটা দার্শনিক কাঠামো আকারে দাড় করানোর চেষ্টা চলছে।

কমিউনিজমের প্রবক্তাদের থেকে বর্ণিত কিছু মূলনীতিঃ

কাল মার্ক্স বলেছে, “আমাদের কাছে এ জড়জগত ছাড়া আর কোন সত্ত্বা নেই। পৃথিবী বস্তুর নিয়মের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়। এর জন্য কোন সার্বজনীন সত্তা বা খোদার প্রয়োজন নেই”

বুহারিন প্রোব ব্যাযেনস্কি তার এবিসি অফ কমিউনিজমে লিখেন, “কোন কমিউনিষ্ট যদি ধর্মে বিশ্বাস করে তাহলে তার সাথে কমিউনিজমের কোন সম্পর্ক নেই। যেসব শ্রমিকের জীবনে ধর্মের প্রভাব আছে তাদের ব্যাপারে খুব সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ। তাদের কাছে এই মতবাদে বিশ্বাসী করতে সূক্ষ্ম ও সুচতুরভাবে এগোতে হবে”

এই নীতির কারণেই চীনদেশে ধর্মের বিরুদ্ধে কমিউনিস্টদের সংগ্রাম অনেকখানি শিথিল করা হয়েছিল


ইসলাম এবং এর বিশ্বাসের সাথে যে কমিউনিজমের ঘৃণার চর্চা কতটা ভয়ংকর সেটা এই ঘটনা থেকে বেশ ভাল বুঝা যায়। আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে কমিউনিজমের মতবাদ সম্মিলিত জাতিসংঘের বিভিন্ন সভা সমিতি হয় মুসলমান ইসলামকে অস্বীকার করতে না পেরে অথবা নিরপেক্ষতার মুখোশে আঁচড় পড়ার ভয়ে হলেও এইসব তাদের করতে হয়। জাতিসংঘ সম্পাদিত মানবাধিকার ঘোষণায় বলা আছে, “আল্লাহর গুণাবলী দিয়ে মানুষকে তৈরী করেছেন”।
কিন্তু এইটুকুতেই সোভিয়েত রাশিয়ার আঁতে ঘা লেগে যায়। তারা এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে ঘোর আপত্তি জানায়। সোভিয়েত প্রতিনিধি অধ্যাপক আলেক্সি প্যাডোলভ বলে দেয়, “মানবিক মর্যাদা ও অধিকারের দিক থেকে যে মানুষ স্বাধীন ও সমান একথা আমরা অস্বীকার করিনা। কারণ মানব স্বাধীনতা সামাজিক কাঠামোরই ফলমাত্র। খোদার উপর বিশ্বাস রাখা সামাজিক অনগ্রসতারই নামান্তর”।
সোভিয়েত অধ্যাপকের এই ঘোষণায় মানুষের মানবিক সত্তাকে অস্বীকার করা হয়েছে। সবকিছুর ভিত্তি দাড় করানো হয়েছে সমাজকে। কমিউনিজমের নীতিতে যেমনটা করা হয়ে থাকে।

নৈতিকতা রক্ষায় কমিউনিজমের এই ব্যর্থতার বিপরীতে ইসলামের সাফল্য থেকে শিক্ষা নেবার মত অনেক কিছু আছে। খোদার একত্ব ও মানবিক খিলাফতের ওপর ভিত্তি করে মানব স্বাধীনতার স্বীকৃতি দিয়েছে। এবং অধিকার রূপায়নের ক্ষেত্রে বাস্তব সামাজ ব্যবস্থা ও আপেক্ষিকতার প্রয়োজনীয়তাও স্বীকার করেছে ইজতিহাদ নীতির মাধ্যমে।
প্রসিদ্ধ ফরাসি ঐতিহাসিক গিজো বলেন, ইসলামই সর্বপ্রথম সামন্তবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। অবশ্য পরবর্তীকালে যে ইসলামী সমাজ গঠিত হয়নি এর জন্য মুসলমানরা দায়ী, ইসলাম দায়ী নয়।

গণতন্ত্র কথাটি পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদ সমানভাবে ব্যবহার করে এসেছে নিজেদের ক্ষমতার রক্ষার জন্য। এতে যদি গনতন্ত্রকে কলুষিত না বলা যায় তাহলে ইসলামকে ব্যবহার করে যারা নিজেদের মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেছে তাহলে তাদের কারণে ইসলামকে কেন দোষী সাব্যস্ত করা হবে। এটা নিছকই একটা যুক্তি বুঝানোর জন্য বলা হল। ইসলাম থিউরিটিকালিও গণতন্ত্রকে সমর্থন করেনা। তবে কোন দিক থেকে যদি গণতন্ত্র ইসলামের সাথে সামঞ্জস্য রাখে তাহলে সেই অনুযায়ী কর্মপন্থা নির্ধারণে ক্ষতি নেই। ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিয়ে যাদের গবেষণা আছে তাদের লেখনি থেকে এমনটাই জানা গেছে।

খাটি ইসলামী সমাজে মানুষের সম্মান ধন সম্পদের ওপর নির্ভর করেনা। কমিউনিজম বলে ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকলেই শোষণের সৃষ্টি হয়। ইসলাম বলে ব্যক্তির হাতে সম্পদ থাকলেই সাধারণ মানুষ তার অধিকার বুঝে পায়।         ইসলাম দেখে তার ধন সম্পদ লাভের উপায় কি বৈধ নাকি অবৈধ। এরপর ইসলাম টাকার পরিমাণের দিকে লক্ষ করে তার উপর সমাজের গরিবদের দায়িত্ব অর্পণ করে। এইভাবেই ইসলাম সামাজিক ভারসাম্য সৃষ্টি করে।    


সূত্রঃ কমিউনিস্ট শাসনে ইসলাম- ড. হাসান জামান

Sunday, November 12, 2017

অবশেষে পদত্যাগ প্রধান বিচারপতির


অবশেষে পদত্যাগ করলেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এস কে সিনহা)। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেয়ার পর সারা দেশে ব্যাপকভাবে আলোচিত প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ছুটি নিয়ে বিদেশে থাকা অবস্থায় পদত্যাগ করলেন। গত শুক্রবার তিনি সিঙ্গাপুর থেকে পদত্যাগপত্র জমা দেন সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসে।

 গত ৩ অক্টোবর থেকে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে এক মাসের ছুটিতে যান প্রধান বিচারপতি। এরপর ১৩ অক্টোবর দেশ ত্যাগ করেন তিনি। প্রধান বিচারপতির অসুস্থতা, ছুটি এবং দেশ ত্যাগ তখন তুমুল আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়। বিএনপি সমর্থক আইনজীবী নেতারা অভিযোগ করেন প্রধান বিচারপতি অসুস্থ নন, তাকে জোর করে ছুটি দিয়ে বিদেশে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। এ দিকে গতকাল তার পদত্যাগের খবর প্রকাশের পর বিএনপির নেতাদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় তাকে পদত্যাগও করানো হয়েছে জোর করে।


আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গত ৩ অক্টোবর সাংবাদিকদের জানান, অসুস্থতার কারণে প্রধান বিচারপতি ১ নভেম্বর পর্যন্ত এক মাসের ছুটিতে গেছেন। ১৩ অক্টোবর দেশ ত্যাগের সময় প্রধান বিচারপতি সাংবাদিকদের বলেন, আমি অসুস্থ না। আমি আবার ফিরে আসব। অন্য দিকে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বারবার সাংবাদিকদের বলেন, প্রধান বিচারপতির পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ সুদূরপরাহত।


গত ৩ জুলাই সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ। এ রায়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের পরিবর্তে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে ফিরিয়ে আনা হয়। ১ আগস্ট পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। ৭৯৯ পৃষ্ঠার এ রায়ের পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি দেশের সংসদ, গণতন্ত্র, নির্বাচন ব্যবস্থা, রাজনীতি, দলীয়করণ, মানবাধিকার, সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, দুর্নীতি, অনিয়ম, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তীব্র সমালোচনা করেন। এই সমালোচনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সারা দেশে সাড়া পড়ে যায়। তোলপাড় সৃষ্টি হয় সরকারের মধ্যে।

অবশেষে লিখিত পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের তিন মাসের মাথায় নানা জল্পনা-কল্পনা শেষে পদত্যাগ করলেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের নজির নেই। গত শুক্রবার গভীর রাতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রধান বিচারপতির পরিবারের পক্ষ থেকে তার পদত্যাগের খবর আসতে থাকে। সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ছোট ভাই নরেন্দ্র কুমার সিনহা গভীর রাতে গণমাধ্যমকে বলেন, প্রধান বিচারপতি তার পরিবারকে জানিয়েছেন, তিনি শুক্রবার সকালে সিঙ্গাপুর থেকে কানাডা যাচ্ছেন। তার আগে তিনি পদত্যাগপত্রে সই করেছেন।
২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন সুরেন্দ্র কুমার সুনহা। ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি তার অবসরে যাওয়ার কথা ছিল।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গতকাল সংবাদমাধ্যমকে জানান, সংবিধান অনুযায়ী নতুন কোনো বিচারপতি নিয়োগ দেয়ার আগ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা দায়িত্ব পালন করে যাবেন।

ষোড়শ সংশোধনী রায়-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ
বর্তমান সরকার সংসদে পাস করা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেয়া রায় এবং রায়ে প্রধান বিচারপতি বিভিন্ন বিষয়ে তীর্যক মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ, প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে সরকার। এক কথায় সরকারের তোপের মুখে পড়েন প্রধান বিচারপতি। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকেও প্রধান বিচারপতির তীব্র সমালোচনা করা হয়। সরকারের ভেতরে বাইরে চলতে থাকে নানা তৎপরতা। প্রধানমন্ত্রী দেখা করেন রাষ্ট্রপতির সাথে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য।

আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতিকে বঙ্গভবনে ডেকে নেন রাষ্ট্রপতি। প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে তুলে ধরা হয় ১১ দফা অভিযোগ, যা প্রকাশ করা হয় সুপ্রিম কোর্টের বিবৃতিতে। শেষ পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় প্রধান বিচারপতি অসুস্থ এবং তিনি ছুটি নিয়েছেন। এরপর দেশ ত্যাগের পর বিদেশে বসেই পদত্যাগের মাধ্যমে আপাতত অবসান হলো তোলপাড় সৃষ্টি করা এ অধ্যায়ের।

 গত ১ আগস্ট ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। ১২ আগস্ট প্রধান বিচারপতির সাথে তার বাসভবনে দেখা করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ১৩ আগস্ট রায় নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা। ১৬ আগস্ট বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রায় নিয়ে আলোচনা করেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয় গণমাধ্যমে। ২২ আগস্ট প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগের দাবি জানিয়ে সময় বেঁধে দেন আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা। অন্যথায় তাকে অপসারণে আন্দোলনের হুমকি দেয়া হয়।

 রায় এবং প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও সরকারের তরফ থেকে প্রতিক্রিয়া বিষয়ে আদালত অবমাননার অভিযোগ ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। প্রধান বিচারপতির কাছে এ বিষয়টি উত্থাপন করা হলে তিনি ধৈর্যধারণের কথা জানান। ২৪ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ শুরুর আগে শেষ অফিস করেন বিচারপতি। ১৩ সেপ্টেম্বর ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় এবং পর্যবেক্ষণ বাতিলের বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নিতে জাতীয় সংসদে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। এ সময় প্রধান বিচারপতির তীব্র সমালোচনা করা হয় সংসদে।

 ১৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট একটি বিবৃতি প্রকাশ করে, যাকে আইন অঙ্গনে বিরল ঘটনা বলে অভিহিত করেন অনেকে। সুপ্রিম কোর্টের বিবৃতিতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ গত ৩০ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের বিচারপতিদের ডেকে নিয়ে বিচারপতি সিনহার বিরুদ্ধে ১১টি অভিযোগ তুলে ধরেন। এর মধ্যে বিদেশে অর্থ পাচার, আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, নৈতিক স্খলনসহ আরো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

 বঙ্গভবন থেকে ফিরে পরদিন ১ অক্টোবর আপিল বিভাগের পাঁচজন বিচারপতি ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার, বিচারপতি ইমান আলী নিজেরা বৈঠক করে বিষয়টি নিয়ে প্রধান বিচারপতির সাথে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর তারা প্রধান বিচারপতির হেয়ার রোডের বাড়িতে গিয়ে এই বিষয়ে কথা বললে প্রধান বিচারপতি দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম ও নৈতিক স্খলনেরওই অভিযোগগুলোর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাদিতে পারেননি বলে সুপ্রিম কোর্টের বিবৃতিতে বলা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, এরপর আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতি তাকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, এই অবস্থায় অভিযোগগুলোর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তার সাথে একই বেঞ্চে বসে তাদের পক্ষে বিচারকাজ পরিচালনা সম্ভবপর হবে না।

 ৩ অক্টোবর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের জানান, প্রধান বিচারপতি অসুস্থ। তাই তিনি ৩ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত ছুটিতে গেছেন। রাষ্ট্রপতিকে লেখা চিঠিতে প্রধান বিচারপতি জানিয়েছেন তিনি ক্যান্সারের রোগী, আরো অন্যান্য রোগে তিনি আক্রান্ত। ফলে তার বিশ্রাম দরকার।

 ১৩ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে দেশত্যাগের আগে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমি অসুস্থ না। আমি পালিয়েও যাচ্ছি না। আমি আবার ফিরে আসব। আমি একটু বিব্রত। আমি বিচার বিভাগের অভিভাবক। বিচার বিভাগের স্বার্থে, বিচার বিভাগটা যাতে কলুষিত না হয়, এ কারণেই আমি সাময়িকভাবে যাচ্ছি।
গত শুক্রবার ছুটির মেয়াদ শেষে তার দেশে ফেরা এবং প্রধান বিচারপতি পদে ফিরে আসা নিয়ে কৌতূহল সৃষ্টি হয় বিভিন্ন মহলে। অবশেষে শুক্রবার গভীর রাতে খবর এলো পদত্যাগ করেছেন প্রধান বিচারপতি।

 বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ তার পদত্যাগের খবরে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে গতকাল শনিবার এক আলোচনা সভায় বলেন, আজকের দিনটি বিচার বিভাগ ও আদালতের স্বাধীনতার জন্য কলঙ্কের দিন। তাকে জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছে। বিচার বিভাগের যে সামান্য স্বাধীনতা ছিল এই সরকার তাও নস্যাৎ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, ষোড়শ সংশোধনীর রায় সরকারের বিপক্ষে গেছে বলেই এ ঘটনা ঘটল। তারা সমন্বিতভাবে সিনহাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করল।


কী ছিল ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে
সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করে বর্তমান সরকার সংবিধানে ষোড়শ সংশোধনী পাস করে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সে সংশোধনী বাতিল করে রায় দেন। এ সম্পর্কিত রায়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, দলীয় আনুগত্য আর অর্থ নয় বরং মেধাকেই প্রাধান্য দিতে হবে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে এবং প্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রে।

আমাদের লোকএই জঘন্য নীতি থেকে মুক্তি পেতে হবে। এ ছাড়া আমি একাইসব কিছু করেছি আমিত্বর এই আত্মঘাতী পথ থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা একটি রোগে আক্রান্ত হয়েছি। এ রোগের নাম অদূরদর্শী রাজনীতিকরণ। জঘন্য এ রোগের কারণে নীতিনির্ধারকেরা সব কিছু ব্যক্তিকরণ করে ফেলেছেন। তারা তাদের ুদ্র এবং সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থে একটি ভুয়া ও মেকি গণতন্ত্রপ্রতিষ্ঠা করেছেন। আমাদের অবশ্যই এই নোংরা আমাদের লোকমতবাদ পরিহার করতে হবে।

 সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, আমাদের দেশে রাজনীতি এখন আর মুক্ত নয়। এটা এখন অতিমাত্রায় বাণিজ্যিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। রাজনীতির চালকের আসনে রয়েছে অর্থ। আর এ অর্থই নির্ধারণ করছে রাজনীতির কর্মধারা ও গন্তব্য। এখন মেধা নয় ক্ষমতাই নিয়ন্ত্রণ করছে দেশের সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এখন কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে গুটিকয়েক লোকের হাতে। আর ক্ষমতা সংহত করার এই আত্মঘাতী প্রবণতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ক্ষমতার লোভ প্লেগের মতো। একবার এ রোগ পেয়ে বসলে সব গ্রাস করতে চেষ্টা করে।

বলার অপেক্ষা রাখে না এটা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের আদৌ কোনো লক্ষ্য বা দর্শন ছিল না। আমাদের পূর্বপুরুষেরা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছিলেন, কোনো ক্ষমতাবান দৈত্য তৈরির জন্য নয়। তিনি লিখেছেন গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে নির্বাচন অপরিহার্য। কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ও পক্ষপাত ছাড়া নিরপেক্ষভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে না পারলে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া গ্রহণযোগ্য সংসদ গঠিত হতে পারে না। জনগণ নির্বাচন কমিশন ও সংসদের প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না।

 রায়ে তিনি বলেন, হাইকোর্টে ষোড়শ সংশোধনী রায় বাতিল হওয়ার পর এ বিষয়ে সংসদে যে ধরনের সমালোচনা হয়েছে এবং যেসব অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে তাতে এটা প্রমাণ করে যে, আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্র অপরিপক্ব।

অকার্যকর আর অপরিপক্ব সংসদ, কেনাবেচার সংস্কৃতি প্রভৃতি কারণে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকা উচিত নয়। এতে বিচার বিভাগ অতিমাত্রায় রাজনীতিকরণের শিকার হবে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ চলে যায়। এ কারণে সংসদ সদস্যরা দলের নির্দেশনা বা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারেন না। দলের হাইকমান্ডের কাছে তারা জিম্মি। এ অবস্থায় উচ্চ আদালতের বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকার পরিণতি হবে বিচারপতিদেরও দলের হাইকমান্ডের করুণায় পরিণত করা। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের দেশে বিদ্যমান অবস্থায় সংসদের হাতে এ ক্ষমতা দেয়া হবে চরম আত্মঘাতী পদক্ষেপ।


সূত্রঃ http://m.dailynayadiganta.com/detail/news/267713

Friday, November 10, 2017

র‍্যান্ড কর্পোরেশন সম্পর্কে ইউসুফ আল কারযাবীর বক্তব্য


আল জাজিরা অ্যারাবিকে ধর্ম ও জীবনশীর্ষক একটি অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচারিত হয়। ২০০৪ সালের ৫ ডিসেম্বর খাদীজা বিন কিন্নাহর সঞ্চালনায় এতে একটি সাক্ষাৎকার দেন শায়খ ইউসুফ আল কারযাভী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের র‍্যান্ড করপোরেশনের তৈরি ‘Civil Democratic Islam: Partners, Resources and Strategies’ প্রতিবেদনটি নিয়ে তিনি খোলামেলা কথাবার্তা বলেছেন। Biyokulule Online-এ প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটির ইংরেজি অনুবাদ থেকে সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য বাংলায় অনুবাদ করেছেন মো. হাবিবুর রহমান হাবীব।

বিন কিন্নাহ: ৯/১১-র পর ইসলামপন্থী বিভিন্ন ধারা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গন সরব হয়ে ওঠেছে। এসব নিয়ে পাশ্চাত্যে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে। এরমধ্যে সবচেয়ে সিরিয়াস গবেষণাগুলো সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী বিভাগগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট করপোরেশনগুলো করে থাকে। যেমন র‍্যান্ড করপোরেশন। ওয়াশিংটনভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি  প্রভাব-প্রতিপত্তি ও উচ্চ অবস্থানের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
 র‍্যান্ড করপোরেশনের প্রতিবেদনটি ওয়াশিংটনের নীতি-নির্ধারকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। তারা প্রতিবেদনটিকে পশ্চিমা সভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়ানো ইসলামপন্থাকে সামাল দেয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হিসেবে বিবেচনা করছে। এই প্রতিবেদনে ইসলামের একটি সিভিল ও ডেমোক্র্যাটিক পরিচয় সংবলিত নতুন একটি ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। এতে ইসলামপন্থী ধারাগুলোকে চারটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে: (১) সনাতনধর্মী, (২) চরমপন্থী, (৩) ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী এবং (৪) আধুনিকতাবাদী।
 সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, প্রতিবেদনটিতে সিভিল ডেমোক্র্যাটিক ইসলাম প্রতিষ্ঠার কৌশল নির্ধারণ নিয়েও কথা বলা হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য সহযোগী নির্বাচনের বিষয়ে বলা হয়েছেসহযোগীরা যেন আধুনিকতা ও গণতন্ত্রের পাশ্চাত্য মানে উত্তীর্ণ হয় এবং তাদের তৎপরতা যেন গণতান্ত্রিকভাবে স্থিতিশীল, সামাজিকভাবে উন্নত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা মাফিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক  হয়।

র‍্যান্ড করপোরেশনের এই প্রতিবেদন নিয়ে আপনি কিছু বলুন, প্লিজ।

কারযাভী: এটি তো ২০০৩ সালের মার্চে প্রকাশিত হয়েছে। অথচ মিডিয়াগুলো এতোদিন পর সরব হয়েছে।

বিন কিন্নাহ: প্রতিবেদনের শিরোনামে উল্লেখিত সিভিল ডেমোক্র্যাটিক ইসলামনিয়ে কিছু বলুন। সিভিলশব্দের মানে যদি হয় রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করাআর ইসলাম শব্দটির আগে ব্যবহৃত ডেমোক্র্যাটিকশব্দটি ইঙ্গিত করছে যেন ইসলামের আরেকটি অগণতান্ত্রিক ভার্শন রয়েছে

কারযাভী: ইসলাম হচ্ছে একটি সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থা। কিন্তু পশ্চিমারা রাজনৈতিক ইসলামঅরাজনৈতিক ইসলাম’– এ জাতীয় ভাগ করতে পছন্দ করে। ইসলাম শুরার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত এবং মানবাধিকার ও স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ইসলাম ভিন্ন মতাবলম্বীদের সাথে আলোচনার পথ খোলা রাখে, অন্যদের প্রতি সহনশীলতা দেখায় এবং নারীর ন্যায্য অধিকার, দরিদ্রের প্রতি দায়িত্ববোধ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা বলে।

বিন কিন্নাহ: আপনার মতে, ইসলাম একটি সামগ্রিক পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। তাই একে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায় না। এর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যাদানের সুযোগও নেই। কিন্তু র‍্যান্ডের প্রতিবেদনে ইসলামপন্থীদের বিভিন্ন ধারা দেখানো হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী এগুলো হলোচরমপন্থী, সনাতনধর্মী, আধুনিকতাবাদী ও সেক্যুলার ধারা।

কারযাভী: নানা কারণেই এ ধরনের  শ্রেণীবিভাগে আমার আপত্তি রয়েছে। প্রথমত, প্রতিবেদনটিতে ইসলামপন্থীদেরকে আধুনিকতাবাদী ও সেক্যুলারপন্থী ধারায় ভাগ করা হয়েছে, যদিও আধুনিকতাবাদী ও সেক্যুলারপন্থীরা ইসলামপন্থার সম্পূর্ণ বিরোধী।

বিন কিন্নাহ: কিন্তু তারা তো মুসলিম, তাই না?

কারযাভী: নিশ্চয় তারা মুসলিম। কিন্ত একজন মুসলমান এবং একজন ইসলামপন্থীর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আমরা সচরাচর জাতীয়তাবাদী, সেক্যুলারপন্থী, ইসলামপন্থী, কমিউনিস্ট কিংবা মার্কসবাদী ইত্যাদি শ্রেণীবিভাগ করে থাকি। কিন্তু এই প্রতিবেদনে যাদের কথা বলা হচ্ছে, তারা তো ইসলামের ধার ধারে না। তারা ইসলামকে চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে না। তারপরও তাদেরকে ইসলামী ধারায় অন্তভুর্ক্ত করা হয়েছে। যারা ইসলামকে চূড়ান্ত মানদণ্ড মনে করে না, তাদের পক্ষে কীভাবে ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে একটি দেশ পরিচালনা করা সম্ভব? আমার আপত্তিটা এখানেই।

অন্যদিকে, যে ধারাটিকে আমি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি প্রতিবেদনটিতে তা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। সেটা হল পুনর্জাগরণবাদী-সংস্কারপন্থী ধারা (আত তায়্যিরুল ইসলাহী আল তাজদীদী)। ইসলামের মধ্যপন্থা ও ইসলামের আলোয় আলোকিত এই ধারাটি  ইসলামী শরীয়াহর মূলনীতিকে সমুন্নত রেখেই যুগের পরিবর্তনের বাস্তবতাকে মেনে নেয়। এই ধারাটি ইসলাম ও ইসলামী ঐতিহ্যকে একভাবে দেখে; আর সমসাময়িক যুগ, যুগের গতিধারা ও সমস্যাগুলোকে আরেক দৃষ্টিতে বিবেচনা করে। এই ধারাটি সহীহ হাদীসের সাথে যৌক্তিকতার সমন্বয় সাধন করে চলে।

এই পুনর্জাগরণবাদী-সংস্কারপন্থী ধারাটি ইমাম মোহাম্মদ আব্দুহ, তাঁর ছাত্র শায়খ রশিদ রিদা এবং তাঁদের অনুসারীদের সময় থেকে পরিচিত। এদের মধ্যে  উল্লেখযোগ্য হলেন আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শায়খ মাহমুদ শালতুত, মুসলিম ব্রাদারহুডের ড. মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বুরাজ ও শায়খ হাসান আল বান্না এবং শায়খ মোহাম্মদ আল গাযালী।

যে ধারাটির সবচেয়ে বেশি গণভিত্তি রয়েছে, সেই ধারাটিকে প্রতিবেদনে কীভাবে এড়িয়ে যাওয়া হলো? একটি স্বতন্ত্র ধারা হওয়া সত্ত্বেও তারা একে স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে বিবেচনা করেনি। এটি সনাতনধর্মী কিংবা চরমপন্থীকোনো ধারার মধ্যেই পড়ে না। এমনকি তারা আমাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবে, তা নিয়েও দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল। ফলে শেষপর্যন্ত আমাকে সনাতনধর্মী ধারায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, যদিও আমি কখনোই সনাতনধর্মী ছিলাম না। শুরু থেকেই আমি সংস্কারের পক্ষে বলে এসেছি। আমি ফেরকাবাদিতা, চরমপন্থা ও কঠোরতার বিপক্ষে এবং উদারতার পক্ষে।

বিন কিন্নাহ: কিন্তু সনাতনধর্মী তথা ট্র্যাডিশনালিস্টদের মধ্যেও তো দুটি ভাগ রয়েছেরক্ষণশীল সনাতনধর্মী এবং সংস্কারপন্থী সনাতনধর্মী।

কারযাভী: সংস্কারপন্থী এবং সনাতনপন্থী একসাথে চলতে পারে না। কেননা সনাতনপন্থীরা সংস্কারকে গ্রহণ করে না। পুনর্জাগরণবাদী-সংস্কারপন্থী ধারাটি একটি স্বাধীন ধারা। আরেকটি কথা হলো, আধুনিকতাবাদী ও সেক্যুলারপন্থীদেরকে যদি ইসলামপন্থী ধারায় অন্তর্ভুক্ত করতেই হয় (যদিও তা শুনতে অদ্ভূত লাগে), তাহলে চরমপন্থী, উগ্র ও বিপ্লববাদী ধারাগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এমনকি তাকফিরী ধারাকেও (যারা অন্যদেরকে প্রত্যাখ্যান করে, এমনকি তাদের সাথে দ্বিমত করলে মুসলমানদেরকেও খারিজ করে) অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সনাতনী ধারা, যেমন তালেবান, সেকেলে  চিন্তাভাবনাকেই আঁকড়ে ধরে থাকে। কিন্তু প্রতিবেদনটির লেখিকা বোন শেরল বেনার্ড এবং তার মুসলিম স্বামী, যিনি আফগান ইতিহাসের উপর একজন বিশেষজ্ঞ এবং কাবুলে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত, পুনর্জাগরণবাদী-সংস্কারপন্থী ধারাটিকে নিরপেক্ষ ও ন্যায্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে ব্যর্থ হয়েছেন।

বিন কিন্নাহ: আধুনিকতাবাদী ও সেক্যুলারপন্থীদেরকে ইসলামপন্থী ধারায় অন্তর্ভুক্ত করায় আপনি অবাক হয়েছেন। এই অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে প্রতিবেদনটি কি তাহলে আগামীতে সিভিল ডেমোক্র্যাটিক ইসলামনির্মাণে আধুনিকতাবাদী ও সেক্যুলারপন্থীদের উপর নির্ভর করতে চায়?

কারযাভী: তারা নিজেরাই তো এমনটি বলেছে। এটি তো আমাদের করা কোনো মন্তব্য বা অনুমান নয়। তারাই বলেছে, তারা আধুনিকতাবাদী এবং সেক্যুলারপন্থীদের উপর নির্ভর করতে চায়। তারা বলেছে, তারা তাদেরকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসাবে, তাদের পদমর্যাদা বৃদ্ধি করবে এবং মিডিয়া ও শিক্ষা ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান দৃঢ় করবে; যেন স্কুল কারিকুলামে তাদের চিন্তাধারা অন্তর্ভুক্ত করা যায় এবং এমন রাজনৈতিক কর্মসূচি তৈরি করা যায়, যার মাধ্যমে তারা সমাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারবে। তারা তাদের মাধ্যমে কিছু একটা হাসিল করতে চায়।

আমি মনে করি, এসব করে তারা ভুল করছে। আমেরিকার কানে যদি আমাদের কথা পৌঁছে থাকে, তাহলে তাদেরকে বলতে চাইএই মানুষগুলোর মাধ্যমে তোমরা কিছুই অর্জন করতে পারবে না। কারণ, মুসলিম সমাজ তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছে। অতএব, যে সমাজে তারা প্রত্যাখ্যাত, সেই সমাজের নেতৃত্ব তারা কীভাবে দেবে? এটা অসম্ভব। এরা যে জনপ্রিয় নয়, এদের যে কোনো গণভিত্তি নেই, লোকেরা এদেরকে যে গ্রহণ করে নাএসব তো তারা স্বীকার করেছে। তারপরও এদেরকে দিয়ে তারা ফায়দা লুটতে চায়। এতে কি তারা সফল হবে? আমি মনে করি না। কারণ, এটা স্বভাববিরুদ্ধ ব্যাপার। যারাই রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দিতে চাইবে, তাদেরকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের প্রকৃতি এবং নৈতিক ভিত্তিকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হবে। আর আমাদের নৈতিক ভিত্তির সর্বাগ্রে রয়েছে ইসলাম।

আমেরিকানরা আসলে একটি নতুন ইসলাম তৈরি করতে চায়। সেটি হলো আমেরিকান ইসলাম। তারা সবকিছুতে একটি আমেরিকান ফ্লেভার দিতে চায়।

বিন কিন্নাহ: কিন্তু তারা তো বলছে, এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য হলো ৯/১১-র ঘটনার পর উদ্ভূত চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়াই করা। এটা তাদের ঘোষিত লক্ষ্য। ৯/১১-তে কী এমন ঘটলো, যার ফলে একটা নতুন ইসলাম খোঁজা দরকার হয়ে পড়লো?

কারযাভী: চরমপন্থা ৯/১১-র আগেও ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। তাছাড়া চরমপন্থীরা শুধু মুসলমানদের মধ্যেই নয়, ইহুদীদের মধ্যেও রয়েছে। রবিনকে (ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী) চরমপন্থীরা হত্যা করেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমায় সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলা, ব্রিটেন, জাপান, ইন্ডিয়াসহ বিভিন্ন দেশে সংঘটিত সন্ত্রাসীমূলক ঘটনা থেকে বুঝা যায় চরমপন্থীরা সবখানেই আছে। তাহলে শুধু ইসলামকে কেন সহিংসতা ও চরমপন্থার জন্য দায়ী করা হচ্ছে। এটি একদম অন্যায়।

বিন কিন্নাহ: যা হোক, এই প্রতিবেদনে ইসলামপন্থী ধারাগুলোর যে শ্রেণীভাগ করা হয়েছে, সে বিষয়ে আপনার সমালোচনা সত্ত্বেও কিছু ইতিবাচক দিকও নিশ্চয় রয়েছে। উল্লেখিত ধারাগুলোর মধ্যকার পার্থক্যগুলো তুলে ধরতে তারা অক্লান্ত পরিশ্রম ও গবেষণা করেছে।

কারযাভী: প্রতিবেদকদের প্রচেষ্টার জন্য প্রশংসা তো করাই যায়, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যারা ইসলামের মৌলিকত্ব অক্ষুন্ন রেখে সমসাময়িক বাস্তবতাকে গ্রহণ করে, সেই পুনর্জাগরণবাদী-সংস্কারপন্থী মধ্যপন্থী ধারাটিকে তারা এড়িয়ে গেছে। তারা একে একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে বিবেচনা করেনি। যদিও তারা অন্যান্য ধারাগুলোকে শ্রেণীবদ্ধ করেছে এবং হিজাব, নারী অধিকার, ইসলামী দণ্ডবিধি, সংখ্যালঘুসহ সকল বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ধারাটির অবস্থান তুলে ধরেছে।

বিন কিন্নাহ: এ ধরনের একটি ব্যাপক বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য যেসব দরকারী তথ্য প্রয়োজন, সম্ভবত সেসব সংগ্রহ করা যায়নি। যা হোক, দ্বন্দ্বসংঘাতের ক্ষেত্রে ধর্মের ভূমিকা নিয়ে কথা বলা যাক। কারণ, কেউ কেউ মনে করে এই প্রতিবেদনটি হলো দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে একটি ধর্মীয় রূপ দেয়ার স্পষ্ট প্রচেষ্টা মাত্র। আপনি কী মনে করেন?

কারযাভী: এটা অনিবার্য ব্যাপার। এই সংঘাতের পেছনে যে ধর্ম রয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সভ্যতা কিংবা সংস্কৃতির সংঘাত বলে তাদের যে ন্যারেটিভ রয়েছে, এটি অনেকটা সেরকম। আসলে তারা বলতে চায়, সংঘাতটা ধর্মের সাথে ধর্মের, যেহেতু প্রত্যেকটি সংস্কৃতির পেছনে ধর্ম রয়েছে। অন্যদিকে আমরা এটিও জানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতায় যারা আছে এবং বর্তমানে যারা দেশটির নীতি-নির্ধারণ করছে, তারা ইহুদীবাদী এবং কট্টর খ্রিষ্টান ডানপন্থী।

বিন কিন্নাহ: ধর্মের পরিবর্তন সাধন যে খুব সহজ কাজ নয়, র‍্যান্ডের প্রতিবেদনে তা স্বীকার করা সত্ত্বেও কেউ না কেউ তুরস্কের উদাহরণ দিয়ে বলতে পারেদেখো, তুরস্কের উসমানীয় সাম্রাজ্য কীভাবে একটি সেক্যুলার রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, রাষ্ট্রটি কীভাবে আধুনিকতা ও সেক্যুলার মূল্যবোধগুলো সমুন্নত করেছে। সুতরাং র‍্যান্ডের পরিকল্পনা বাস্তবায়নযোগ্য।

কারযাভী: কিন্তু তুরস্কের জনসাধারণের মধ্যে কি কোনো পরিবর্তন এসেছে? তাদের কাছে ধর্ম এখনো মৌলিক বিষয়। সেক্যুলারিজম থাকা সত্ত্বেও সামাজিক একক হিসেবে পরিবারগুলো ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত ইসলামী প্রজাতন্ত্রগুলোতে মানুষ যেভাবে ধর্মীয় মূল্যবোধ সংরক্ষণে সক্ষম হয়েছিল, সেই একই ঘটনা তুরস্কের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) কেন ক্ষমতায় আসতে পেরেছে? ধর্মীয় ভিত্তির উপর ভর করেই তারা ক্ষমতায় এসেছে। যদিও তুরস্কের সেনাবাহিনী ধর্মহীনতার রক্ষক।

বিন কিন্নাহ: র‍্যান্ডের প্রতিবেদনে মুসলিম দেশগুলোর বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হিসেবে সেক্যুলারিজমের পাশাপাশি  সুফিবাদের কথাও বলা হয়েছে, যাতে করে ইবাদত ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের চর্চা কেবল আধ্যাত্মিক পর্যায় পর্যন্ত সীমিত থাকে। প্রতিবেদনটিতে যে ধরনের সুফিবাদের প্রস্তাব করা হয়েছে, সে বিষয়ে আপনার মতামত কী?

কারযাভী: আমার কাছে অবাক লাগে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মের দিকে প্রত্যাবর্তন এবং ধর্মপন্থী লোকেরা দেশটি শাসন করা সত্ত্বেও তারা মুসলমানদেরকে ধর্ম থেকে ফিরিয়ে রাখতে চায়। তরুণ, নারী, গ্রাম ও শহরবাসী, বুদ্ধিজীবী ও অশিক্ষিত সকলের সমগ্র জীবনে নানা মাত্রায় ইসলামের প্রভাব রয়েছে। ইসলামের পুনর্জাগরণের ফলে এটা ঘটেছে। এই প্রতিবেদনসহ পুরো ব্যাপারটির উদ্দেশ্য হলো ধর্মের সেই উপযোগিতাকে মুছে ফেলা। এটি পাশ্চাত্যের নতুন কোনো প্রচেষ্টা নয়। ষাটের দশকে তারা মিশরে একই ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। তখন একটি ডকুমেন্টে দেখানো হয়েছিল ধার্মিকতার বিরুদ্ধে লড়াই করে ইসলামী ধারাগুলোকে কীভাবে দুর্বল করা যায়। কারণ, ধার্মিকরাই হলো ইসলামের শক্তির উৎস। স্কুল ও সংবাদমাধ্যমগুলোতে ধর্মের ইতিবাচক ভূমিকা আড়াল করার নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে তারা তিউনিশিয়াসহ অন্যান্য দেশেও এই প্রচেষ্টা চালিয়েছিল।

বিন কিন্নাহ: প্রতিবেদনে হানাফী মাজহাবকে উৎসাহিত করা হয়েছে। কারণ, তারা মনে করে হানাফী মাজহাব অন্যদের তুলনায় আধুনিকতাপ্রবণ। অথচ যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের যেসব ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে, তারা কিন্তু একইসাথে হানাফী মাজহাব ও তালেবানের অনুসারী। এটি কি তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের স্ববিরোধী নীতি নয়?

কারযাভী: হানাফী মাজহাবকে তারা বুঝতে পেরেছে বলে আমি মনে করি না। একদল বিশেষজ্ঞের মতামতের উপর ভিত্তি করে হানাফী মাজহাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেহেতু হানাফী মাজহাব বিশেষজ্ঞদের মতামতের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, তাই তাদের ধারণা এটা আধুনিকতার কাছাকাছি। যদিও এই মাজহাবের অনুসারীরা তালেবানসহ অন্যান্য সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছে। আসলে ইসলামের সকল মাজহাবেরই কিছু শক্তিশালী ও দুর্বল দিক রয়েছে। আমরা যদি একটি উন্নত রাষ্ট্র গড়তে চাই, সেই রাষ্ট্রের জন্য সংবিধান ও আইন প্রণয়ন করতে চাই, তাহলে সকল মাজহাবের ভালো দিকগুলো গ্রহণ করাই উত্তম।

বিন কিন্নাহ: বহু বিবাহ, ইসলামী দণ্ডবিধি (যেমনচোরের হাত কাটা, ব্যাভিচারীকে বেত্রাঘাত ও পাথর নিক্ষেপ), হিজাব, স্ত্রীকে প্রহার করা, সংখ্যালঘুদের মর্যাদা, গণতন্ত্র এবং ইসলামী রাষ্ট্র ও মানবাধিকারসহ একটি দীর্ঘ তালিকা প্রতিবেদনটিতে রয়েছে। এই প্রত্যেকটি বিষয়ে ইসলামপন্থী ধারাগুলোর কোনটির অবস্থান কী, তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইসলামী দণ্ডবিধির কথা যদি ধরি, তাহলে আমরা দেখি সেক্যুলাররা এর বিরোধী।

কারযাভী: আমি আশা করেছিলাম, প্রতিবেদনটিতে এই ইস্যুগুলোর ব্যাপারে পুনর্জাগরণবাদী-সংস্কারপন্থী ধারাটির অবস্থানের উল্লেখও থাকবে। কারণ, আমরা চোরের হাত কাটার আগে অবশ্যই ক্ষুধার্তকে অন্ন, বস্ত্রহীনকে বস্ত্র, বেকারদের কর্মসংস্থান, অশিক্ষিতদেরকে শিক্ষা, অসুস্থকে চিকিৎসা সেবা, অভাবীকে সহায়তা, গৃহহীনকে আশ্রয় এবং এতিমদেরকে দেখাশোনার ব্যবস্থা করার কথা বলি। শাস্তিপ্রয়োগের পূর্বশর্ত হিসেবে আমাদেরকে অবশ্যই প্রথমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমরা জানি, খরায় জনদুর্ভোগের কারণে খলিফা ওমর (রা) এক বছরের জন্য শাস্তি স্থগিত করেছিলেন।

বিন কিন্নাহ: র‍্যান্ডের এই প্রতিবেদনে বেশ কয়েকবার আপনার নাম এসেছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, আপনাকে সনাতনধর্মী-সংস্কারপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অথচ আপনি পুনর্জাগরণবাদী-সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত। আপনি নিজে আপনাকে কীভাবে চিত্রিত করবেন?

কারযাভী: র‍্যান্ডের প্রতিবেদনে পুনর্জাগরণবাদী-সংস্কারপন্থী স্বতন্ত্র ধারাটিকে এড়িয়ে যাওয়ায় এ রকম হয়েছে। আমাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবে, সেটি তারা জানে না। ফলে তারা আমাকে সনাতনধর্মীদের কাতারে ফেলেছে। কিন্তু তারা আবার এই শ্রেণীটির দুটি ভাগ করেছেসনাতনধর্মী, সংস্কারপন্থী সনাতনধর্মী। কেন তারা এটি করেছে? যে স্বাধীন ধারাটি নিজস্ব মতামত, স্বাতন্ত্র্য ও নিজস্ব ভিত্তির কারণে সুপরিচিত, তাদেরকে কেন আলাদা ধারা হিসেবে আলোচনা করা হয়নি? অথচ তারা আরো অনেক কিছুই উল্লেখ করেছে। আপনি হয়তো জানেন, এসব কথার মধ্যে রয়েছে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট

বিন কিন্নাহ: হ্যাঁ, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটি সরকারী নথিতে আপনার ব্যাপারে সম্মানজনক কথা থাকায় কংগ্রেসম্যান টম ল্যানটোস এক চিঠিতে কলিন পাওয়েলকে দোষারোপ করেছেন।

কারযাভী: এই নথি সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। তারা কখন কোন প্রেক্ষাপটে এটি করেছিল, তাও আমার জানা নেই। ৯/১১-র হামলার নিন্দা করায় হয়তো তারা তখন আমার নাম তাদের নথিতে উল্লেখ করেছিল।

বিন কিন্নাহ: কিন্তু কংগ্রেসম্যান টম ল্যানটোসের চিঠিতে এই অভিযোগও ছিল যে, আপনি আত্মঘাতী অপারেশনকে উৎসাহিত করেছেন।

কারযাভী: এখানেই তো সমস্যা। প্রতিবেদনটিতে তারা একাধিকবার উল্লেখ করেছে, আমার সমস্যা হলো আমি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির বিরোধী। সামাজিক বিষয়াদিতে আমার পুনর্জাগরণবাদী-সংস্কারপন্থী প্রগতিশীল মতামতের সাথে তারা একমত। এসব বিষয়ে সাধারণত তাদের কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু মার্কিন বৈদেশিক নীতির ব্যাপারে আমার অবস্থানের তারা বিরোধী। আমি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সমালোচক। বিশেষ করে মুসলিম দেশসমূহ এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে তাদের নীতির সমালোচনা করি। ইসরাইলের প্রতি তাদের চরম পক্ষপাতিত্বেরও আমি সমালোচক। অর্থ, অস্ত্র এবং ভেটোক্ষমতা দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা না করলে ইসরাইল কখনোই ফিলিস্তিনে ধ্বংসযজ্ঞ, হত্যা, বর্বরতা, সম্পদ বিনষ্ট এবং উচ্ছেদ কর্মকাণ্ড চালাতে পারতো না।

একই কথা ইরাকের বেলায়ও প্রযোজ্য। ফালুজা শহরের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ, মসজিদও যেখানে রেহাই পায়নি, আমি কীভাবে তা মেনে নেবো? তারা মসজিদের ধর্মীয় পবিত্রতাকে পর্যন্ত সম্মান করেনি। তারা শহরের হাসপাতাল পর্যন্ত ধ্বংস করেছে। হাসপাতালের মানবিক মর্যাদাকেও সম্মান করেনি। তারা মসজিদে আশ্রয় নেয়া একজন ব্যক্তিকে পর্যন্ত হত্যা করেছে। অথচ তিনি ছিলেন আহত। চিকিৎসা দেয়ার পরিবর্তে তাকে হত্যা করা হয়েছে। আহতদের উদ্ধারকারী দলকে পর্যন্ত তারা কাজ করতে দেয়নি। আমার আপত্তি তাদের এই পররাষ্ট্রনীতিতে।

বিন কিন্নাহ: এ কারণেই তাহলে প্রতিবেদনটিতে আপনাকে সামাজিক বিষয়ে প্রগতিশীল, কিন্তু পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে কট্টরপন্থী হিসেবে দেখানো হয়েছে।

কারযাভী: এর কারণ হলো, আমার জাতির স্বার্থের পক্ষে কথা বলার জন্য আল্লাহ আমার উপর দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। আমি জাতির স্বার্থ রক্ষায় সবসময় কথা বলে যাবো। উচিত কথা বলতে আমি কাউকে পরোয়া করবো না। আমার ব্যাপারে তারা যা খুশি করুক, এতে কিছু যায় আসে না। তারা তো ৯/১১-র আগেই আমার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

শহীদী অপারেশন (তারা যাকে আত্মঘাতী অপারেশন বলে থাকে) প্রশ্নে আমার কথা হলো, নিজস্ব ভূখণ্ড, আত্মমর্যাদা ও পবিত্র স্থানের প্রতিরক্ষায় ফিলিস্তিনীদের অধিকারের প্রতি আমি সমর্থন জানিয়ে যাবো। দাম্ভিক শক্তিশালী পক্ষ যদি সর্বশক্তি নিয়ে দুর্বলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাহলে তার বিরুদ্ধে এটি দুর্বলের অধিকার। জীবন বিলিয়ে দেয়া ছাড়া তারা আর কীইবা করতে পারে! তাদেরকে যদি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার, যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, মিসাইল ইত্যাদি দেয়া হতো, তাহলে তারা নিশ্চয় নিজেদেরকে বিলিয়ে দিতো না। শক্তিশালী অত্যাচারীর বিরুদ্ধে এটাই হলো দুর্বলের অস্ত্র।

বিন কিন্নাহ: আপনি বলেছেন, প্রতিবেদনে পুনর্জাগরণবাদী-সংস্কারপন্থী ধারাটিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাহলে যে ধারাটির অস্তিত্ব বাস্তবে মুসলিম দেশগুলোতে রয়েছে, তারা তো মার্কিন প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে নিজেদের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে পারে। তারা মার্কিনীদের বোঝাতে পারে, এটি একটি সক্রিয় ও মধ্যপন্থী ধারা, যা এখন সবার জন্য দরকারী।

কারযাভী: আমরা তাই আশা করি। আমি ১০-১৫ বছর আগে ইসলামী আন্দোলনের ভবিষ্যত নিয়ে একটি বই লিখেছিলাম। সেখানে আমি সমস্ত বিষয়ে পাশ্চাত্যের সাথে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছি। অর্থাৎ, ধর্মীয় ইস্যুতে ধর্মগুরু, ধর্মপ্রচারক ও বিশপদের সাথে সংলাপ হতে পারে। মতাদর্শিক ব্যাপারে ওরিয়েন্টালিস্ট, লেখক এবং সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে আগ্রহীদের সাথে সংলাপ হতে পারে। একইভাবে রাজনীতি নিয়ে নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে সংলাপ হওয়া উচিত।

আমরা আশা করি তাদের কাছে পৌঁছতে পারবো এবং আমাদের মধ্যপন্থী আদর্শ তুলে ধরতে পারবো। আমরা তাদেরকে বুঝাতে চাই, ইসলাম সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি মানবিক জীবনব্যবস্থা। ইসলাম মনে করে, একই স্রষ্টার বান্দা এবং একই পিতার সন্তান হিসেবে সকল মানুষ একটি পরিবারের মতো। আমরা যদি তাদের কাছে পৌঁছতে পারি, আমাদের পরিচয় তুলে ধরতে পারি, তাহলে তাদেরকে বলবো, আপনাদের অন্ধ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসুন। এতে আমরা খুশি হবো। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমরা সেই সুযোগ পাচ্ছি না। তারপরও আমাদেকে চেষ্টা করে যেতে হবে। ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর সাংবাদিকদের জন্য আমার দরজা খোলা ছিল। এ মুহূর্তে থমাস ফ্রেডমেনের কথা মনে পড়ছে। তিনি দোহায় আমার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। অবশ্য সেটি কোথাও প্রকাশিত হয়েছিল কিনা, তা আমি জানি না। একইভাবে আমি ফ্রান্স, ইংল্যান্ড বা অন্যান্য স্থানে আরো অনেক পাশ্চাত্যের লোকদেরকে সাক্ষাৎকার দিয়েছি। আমরা নিজেদেরকে গুটিয়ে রাখি না।

বিন কিন্নাহ: মুসলিম দেশগুলোর শিক্ষাক্ষেত্রে র‍্যান্ড করপোরেশনের সহায়তা সম্পর্কে কিছু বলুন।

কারযাভী: মুসলমানরা সবসময়ই পাশ্চাত্য প্রযুক্তি ও এর ব্যবহারিক জ্ঞানকে স্বাগত জানায়। কাতারে র‍্যান্ড করপোরেশন সক্রিয় রয়েছে। সেখানে তারা নিজস্ব পদ্ধতিতে বেসরকারী স্কুল চালু করেছে। তারা মূলত চারটি বিষয়ের উপর জোর দেয়: গণিত, বিজ্ঞান, আরবী ও ইংরেজি। যা হোক, আমাদেরকে মাথায় রাখতে হবে আমরা একটি মুসলিম দেশ। স্কুলগুলোতে অবশ্যই ইসলামিক স্টাডিজ ও ফিকাহ শাস্ত্র থাকতে হবে। আমাদের স্কুলগুলোতে নামাজের প্রশিক্ষণ থাকতে হবে এবং অবশ্যই আমাদের শিশুদেরকে ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ শেখাতে হবে।

বিন কিন্নাহ: র‍্যান্ডের প্রতিবেদনে হাদীস শাস্ত্রকে এড়িয়ে যেতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

কারযাভী: হাদীস শাস্ত্র গভীর জ্ঞানের বিষয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে এটিকে গভীরভাবে বুঝতে হবে।


সূত্রঃ https://cscsbd.com/308

Thursday, November 9, 2017

আরবী সাহিত্যচর্চা : কিছু কথা



সাহিত্য এবং জীবনঘনিষ্ঠ যে কোনো বিষয়ে সুন্দর ও সাবলীল প্রকাশ আল্লাহ তাআলার এক বিরাট নিআমত। নিঃসন্দেহে এই নিআমত যার ভাগ্যে জুটেছে সে অনেক উত্তম জিনিস পেয়েছে। সাহিত্যের আকর্ষণ সব কিছুকে ছাড়িয়ে যায়। সুন্দর ও উত্তম সাহিত্য মনকে আকৃষ্ট করে খুব সহজেই। হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে খুব অল্পতেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
"إن من البيان لسحرا"
নিশ্চয় সুন্দর ও সাবলীল প্রকাশ ভঙ্গিতে যাদু রয়েছে।এই যাদুকে অনেকে বলেছেন, "السحر الحلال" বা হালাল যাদু। তাই কবি-সাহিত্যিকরা তাদের এই মোহনীয় শক্তি আর হালাল যাদু দিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন মানুষের হৃদয়ে। তাইতো কবি সাহিত্যিকদের সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে সকলের কাছেই। মরে যাওয়ার পরও তারা বেঁচে থাকেন যুগ যুগ ধরে।
আমাদের তালিবুল ইলম ভাইদের অনেকেরই মনের ইচ্ছা ও বাসনা আরবী ভাষায় সাহিত্য চর্চা করা। সে ভাষায় কিছু রচনা করা। মনের ভাবটাকে আরবীতে সুন্দর ও সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তোলা। কিন্তু কীভাবে সম্ভব আরবী সাহিত্য রচনা করা? লেখার কৌশলটা রপ্ত করা? মনের ভাবগুলো লেখায় ফুটিয়ে তোলা? ভাষার গাঁথুনী মজবুত করা?
এই প্রশ্নের উত্তর সত্যিই দীর্ঘ। প্রয়োজন অনেক সময় ও দীর্ঘ আলোচনার। তবে কবি-সাহিত্যিক সকলের সর্বসম্মত কথা হচ্ছে, সাহিত্যরুচি তৈরীর জন্য প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণে অধ্যয়ন এবং লেখালেখির চর্চা। সাথে সাথে প্রতিষ্ঠিত ও প্রসিদ্ধ লেখক সাহিত্যিকদের রচনাশৈলীর অনুসরণ করা। তাদের জীবনী অধ্যয়নের মাধ্যমে তাদের লেখার কৌশলগুলোকে ভালভাবে আয়ত্ত করা। এভাবে পর্যাপ্ত পড়াশোনা আর আন্তরিক প্রচেষ্টায় এক সময় নিজের মাঝে চলে আসবে সাহিত্যরুচি, পাকা হবে সাহিত্যের বুনিয়াদ। তৈরী হবে সুন্দর ও সাবলীল ভাষায় ভাব প্রকাশের অভিনব ও সৃষ্টিশীল কৌশল। আমি হয়ে উঠব পরিশীলিত ভাষার অধিকারি। আমার লেখায় ফুটে উঠবে ভাব ও মর্মের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
এক্ষেত্রে সকলের জানতে ইচ্ছে করে কোন্ ধরনের বই পড়বো, এবং কোন্ কোন্ সাহিত্যিকের বই অধ্যয়ন করবো? মূলত বিশেষজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের আলোচনা ও গবেষণায় সাহিত্যচর্চা ও সাহিত্যরুচি তৈরীর জন্য কিছু প্রাচীন ও আধুনিক গ্রন্থ অধ্যয়নের পরামর্শ পাওয়া যায়। সাথে সাথে আমার নিজস্ব অধ্যয়ন থেকেও কিছু গ্রন্থ আমি এক্ষেত্রে যথেষ্ট মুফীদ ও উপকারী পেয়েছি। এই ছোট্ট প্রবন্ধে সেই প্রাচীন ও আধুনিক আরবী সাহিত্য-গ্রন্থসমূহের পরিচিতিসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করার প্রয়াস পেয়েছি।
শুরুতেই কিছু প্রাচীন গ্রন্থের কথা বলি, যার প্রচুর অধ্যয়নেই তৈরী হয়েছে আধুনিক সাহিত্যিকদের সাহিত্য রুচি। শক্তিশালী হয়েছে তাঁদের ভাষার গাঁথুনী। যার উপর ভিত্তি করে তাঁরা পরবর্তীতে তৈরী করেছেন আধুনিক, সৃষ্টিশীল ও সৃজনশীল সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডার। সৃষ্টি করেছেন উত্তম থেকে উত্তম সাহিত্য-সমাহার।
তাই শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধকরণ, বাক্যশৈলী আত্মস্থকরণসহ সাহিত্যরুচি তৈরিতে প্রাচীন গ্রন্থগুলোকেই অগ্রাধিকার দেয়া একান্ত কর্তব্য।
প্রাচীন গ্রন্থগুলোর মধ্যে সেই চারটি গ্রন্থ আমি আগে উল্লেখ করব, যার ব্যপারে "ابن خلدون" তার "مقدمة" -এ বলেছেন-
"و سمعنا من مشايخنا في مجالس التعليم أن أصول هذا الفن و أركانه أربعة دواوين، و هي : أدب الكاتب لابن قتيبة، و كتاب الكامل للمبرد، وكتاب البيان و التبيين للجاحظ، و كتاب النوادر لأبي علي القالي، وما سوى هذه الأربعة فتوابع لها، و فروع عنها."
এবং যাকে ড. ইযযুদ্দীন ইসমাঈল তার গ্রন্থ
"المصادر الأدبية واللغوية في التراث العربي"-أمهات المصادر الأدبية
বলে উল্লেখ করেছেন। সাথে সাথে ব্যাপকার্থে এই গ্রন্থগুলোকে موسوعات في الثقافة الأدبية العربية বা আরবী সাহিত্য সংস্কৃতির বিশ্বকোষ বলে অবিহিত করেছেন।
এক. "البيان والتبيين" লেখক আবু উছমান আল জাহেয। আরবী সাহিত্যের ময়দানে এক অনন্য গ্রন্থ। বয়ান-বক্তৃতা, অলংকার শাস্ত্র ও লেখনী-কৌশলসহ অসংখ্য বিষয় তিনি এ গ্রন্থে একত্রিত করেছেন। ভাষা-বিজ্ঞানের অনেক বিষয়, যা নিয়ে আজ আধুনিক বিশ্বে নতুনভাবে গবেষণার সূত্রপাত ঘটেছে, তা তিনি এই গ্রন্থে সুন্দর ও সাবলীলভাবে আলোচনা করার প্রয়াস পেয়েছেন। তবে এই গ্রন্থের একটি সমস্যাও রয়েছে, আর তা হচ্ছে গ্রন্থটির বিষয়বস্তু আগোছালো। তবে এতদ¦সত্তে¡ও সাহিত্যরুচির ভিত গড়তে এর ভমিকা অনন্য।
দুই. ইবনে মুবাররদ এর الكامل বা الكامل في اللغة والأدبগদ্য ও পদ্য, প্রবাদ-প্রবচন আর অসংখ্য বিষয়ের অনবদ্য আলোচনা রয়েছে এই গ্রন্থে। আরবের সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষীর কথা অর্থাৎ হাদীসের শব্দ অবলম্বন করে কবিতা, প্রবাদ প্রবচনের মাধ্যমে সে শব্দের ব্যবহার দেখাতে দেখাতে তিনি সামনে অগ্রসর হয়েছেন। পাঠককে আনন্দ দিতে কখনও কখনও বিভিন্ন কবি সাহিত্যিকদের ঘটনার অবতারণা করেছেন। কঠিন শব্দের অর্থ না বুঝে হয়ত পাঠক এক পর্যায়ে থেমে যেতে পারে, সে দিকটিও তিনি লক্ষ্য রেখেছেন। তাই কোনো দূর্বোধ্য শব্দ এলেই সাথে সাথে তার অর্থ ও সুন্দর ব্যখ্যা দিয়েছেন। তার এই গ্রন্থের ব্যাপারে তিনি নিজেই ভমিকায় বলেন-
"هذا كتاب يجمع ضروبا من الآداب، ما بين كلام منثور، وشعر مرصوف، و مثل سائر، وموعظة بالغة، واختيار من خطبة شريفة، ورسالة بليغة."
তিন. ইবনে কুতাইবা রচিত أدب الكاتبলেখালেখি আত্মস্থ করার কৌশলসহ অসংখ্য দিকনির্দেশনা তিনি এ কিতাবে দিয়েছেন। শব্দসম্ভার তৈরি, শব্দের সঠিক প্রয়োগ, সঠিক বাক্যগঠন পদ্বতি এবং বিশেষত আরবী বানানের রীতি বা ইমলার বিভিন্ন দিক নিয়ে তিনি চমৎকার আলোচনা করেছেন। লেখালেখিতে হাত পোক্ত করা আর বয়ানে মুখ পাকা করতে তিনি তার কিতাবে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অংশে সুন্দর আলোচনা করেছেন। তবে সবচেয়ে চমৎকার ও আনন্দের বিষয় হচ্ছে, তিনি লেখক ও বক্তার বাহ্যিক দিকের চেয়ে নৈতিক, চারিত্রিক ও আত্মিক দিকের সচ্ছতার দিকে নযর রাখার প্রতি তাকিদ দিয়েছেন। বুঝাতে চেয়েছেন যে সাহিত্যিক যদি নৈতিকতার প্রশ্নে উত্তীর্ণ না হতে পারে, তাহলে তার সাহিত্য সুসাহিত্য হতে পারে না। তিনি তার কিতাবের ভমিকায় বলেন-
"ونحن نستحب لمن قبل عنا وائتم بكتبنا أن يؤدب نفسه قبل أن يؤدب لسانه، ويهذب أخلاقه قبل أن يهذب ألفاظه، ويصون مروءته عن دناءة الغيبة، وصناعته عن شين الكذب، ويجانب – قبل مجانبة اللحن وخطل القول- شنيع الكلام ورفث المزاح."
চার. আবু আলী আল-ক্বালি রচিত النوادر, যাকে أمالي القالي -ও বলা হয়। আরবী সাহিত্যের ময়দানে এক অমূল্য সংযোজন। যাকে আরবী সাহিত্যের ভাণ্ডার বলা চলে। এ কিতাবে আরবদের প্রবাদ-প্রবচন ও বাগধারার ব্যবহার বেশি লক্ষ করা যায়। এছাড়াও গদ্য-পদ্যের বিশাল সমাহার রয়েছে এতে। তবে এ কিতাবের একটি বিশেষ সমস্যা হচ্ছে, এর বর্ণনায় বিক্ষিপ্ততা রয়েছে। সময় ও কালের ধারা এতে রক্ষা করা হয়নি। এছাড়াও এতে কবিতার কবির নাম উল্লেখের ক্ষেত্রে কিছুটা অসচেতনতার ছাপ লক্ষ করা যায়। এ মত বিজ্ঞজনের।
এছাড়াও কবিতা এবং গদ্য লেখার প্রতিভাকে আরো শাণিত ও শক্তিশালী করতে একটি চমৎকার গ্রন্থ المثل السائر في أدب الكاتب و الشاعرরচনা করেছেন ইবনুল আছীর রাহ.। সাহিত্যরুচি তৈরিতে যথেষ্ট উপকারী গ্রন্থ । বিশেষ একটি ভালো দিক হচ্ছে গ্রন্থটি সাজানো গোছানো ও চমৎকার শৈলীতে রচিত। তাই অনেকটা সুখপাঠ্য। পাঠককে সহজেই সামনে অগ্রসর হতে সাহায্য করে। তরতর করে পড়ে ফেলা যায়। আর অনেক আধুনিক সাহিত্যিক তো এমনও বলেছেন যে, এই দৃষ্টিকোণ থেকে এই গ্রন্থটি একক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী বললেও অতিশয়োক্তি হবে না। এই বইটি অধ্যয়ন করে যদি কেউ আত্মস্থ করতে পারে, তাহলে বলা যেতে পারে, সাহিত্য তথা গদ্য ও পদ্য এবং সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে তার এক বিশাল সম্ভার তৈরি হবে। এই ময়দানে সামনে বাড়ার জন্য তাকে সাহস যোগাবে। এ ক্ষেত্রে আরেকটি গ্রন্থالصناعتين , যা রচনা করেছেন أبو هلال العسكريএ গ্রন্থটি থেকে পাঠক আরবী শব্দের অর্থ কীভাবে বের করতে হয়, সাহিত্য সমালোচনা কীভাবে করতে হয় তার দিকনিদের্শনা পাবে। সাথে সাথে এ গ্রন্থে রয়েছে লেখালেখি বিষয়ক অনেক আলোচনা। আরেকটি চমৎকার বিষয় এতে রয়েছে, তা হচ্ছে শব্দ ও অর্থ ব্যবহারের নিয়ম পদ্ধতি।
এছাড়াও আরো অনেক গ্রন্থ আরবী সাহিত্যের মাকতাবায় রয়েছে। যার অধিক পরিমাণে অধ্যয়ন পাঠকের হৃদয়ে তৈরী করবে সাহিত্যের প্রতি টান। যার মুতালাআয় জুড়াবে তার মন ও প্রাণ। তাদের চিন্তার অনুসরণে তৈরী হবে নিজের মাঝেও সৃজনশীল চিন্তা। তাদের লেখার অনুসরণে তৈরী হবে সৃষ্টিশীল লেখা। এজাতীয় গ্রন্থের মধ্যে আরো কিছু হচ্ছে أبو حيان التوحيدي ابن عبد ربه -এর العقد الفريد, ইবনে কুতাইবা রচিত عيون الأخبار, ইবনে হিব্বান আদ্দাবুসী রচিত روضة العقلاء ونزهة الفضلاء এবং جاحظ -এর অন্যান্য গ্রন্থ ।
উপরোল্লিখিত গ্রন্থগুলো সময়ের বিবেচনায় একটু আগের হওয়ায় এর ভাব, রচনাশৈলী, শব্দ ও গতিপ্রকৃতি বুঝতে একটু কষ্ট হবে। তবে কষ্টের কারণে খেই হারিয়ে ফেললে চলবে না। সাহিত্যচর্চা বলে কথা। একটু ধৈর্য্য আর অধ্যাবসায় তো লাগবেই। তবে এরপর অবশ্য পথ অনেকটা মসৃণ।
আধুনিক সাহিত্যিকদের মাঝে যাদের কিতাব অধ্যয়নে বেশি উপকৃত হওয়া যাবে এবং অনেকটা নিকট অতীতের হওয়ায় শব্দ, বাক্য ও ভাষা বুঝতে সহজ হবে তাদের যারা অন্যতম, এবার তাদের কিছু গ্রন্থের আলোচনা করছি।
বিশিষ্ট সাহিত্যিক مصطفى صادق الرافعيআধুনিক সাহিত্যের ময়দানে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। একাডেমিক কোনো পরিচয় তার ছিল না। বড় কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাহিত্যে কোন ডিগ্রিও তার ছিল না। তবে ছিল খোদা-প্রদত্ত প্রতিভা আর কঠিন অধ্যাবসায়। একাডেমিক সনদপ্রাপ্ত সাহিত্যিকরাও তার সাহিত্য প্রতিভার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। তার রচিত সাহিত্যের ভয়সী প্রশংসা করেছেন। তার রচিত وحي القلم এবং كتاب المساكين, সাহিত্যের ভিত গড়তে পাঠককে অনেকটা সহযোগিতা করবে। এছাড়াও তার অন্যান্য গ্রন্থ আরবী সাহিত্যের ময়দানে বিরাট ভূমিকা রাখছে। আর আরবী সাহিত্যের ইতিহাস জানতে তার রচিত تاريخ الأدب العربي -এর কোনো তুলনা নেই।
এই ময়দানে আরেক প্রসিদ্ধ নাম সাহিত্যিক مصطفى لطفي المنفلوطيগদ্য সাহিত্যে তিনি এক অনন্য প্রতিভা। তিনি যাই রচনা করেছেন জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সমাজের খেটে খাওয়া গরীব-দুঃখীদের মনের ব্যথা আর অন্যান্য সকল অসংগতিগুলো কী চমৎকারভাবেই না তিনি তুলে ধরেছেন। আমি আশ্চর্য হই মানুষ এতো সুন্দর লিখতে পারে! আর অনুবাদ সাহিত্যেও তিনি অনন্য ভমিকা রেখেছেন।
তাঁর গ্রন্থগুলো অধ্যয়নের জন্য যদি তার গ্রন্থসমগ্র অর্থাৎ الأعمال الكاملة বা المجموعة الكاملة পাওয়া যায় তাহলে অনেক ভালো অন্যথায়النظرات والعبرات বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আধুনিক আরবী সাহিত্যে আরেক নাম নাজীব কিলানী। তার লেখায় সাহিত্যের সাথে সাথে রয়েছে নৈতিকতার ছোঁয়া। ইসলামী ভাবধারার এক অনন্য সাহিত্যিক তিনি। উপন্যাস, ছোট গল্প এবং প্রবন্ধসহ অনেক গ্রন্থ রয়েছে তাঁর। এর মধ্যে ছোট গল্প موعدنا غدا، عند الرحيل ,دموع الأمير উল্লেখযোগ্য। আর উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে
قاتل حمزة، حارة اليهود، اليوم الموعود، أرض الأنبياء.
রোযনামচা, সফরনামাসহ ঐতিহাসিক বিষয় এবং সমসাময়িক বিষয় নিয়ে সাহিত্য রচনায় আরেক উল্লেখযোগ্য নাম علي الطنطاويতাঁর লেখা থেকে পাঠক পাবেন সুন্দর বর্ণনা কৌশল এবং আরবী শব্দ ব্যবহারের সৌন্দর্য। তাঁর সমস্ত গ্রন্থগুলোই উপকৃত হওয়ার মত। তবে বিশেষভাবে তার ذكريات উল্লেখযোগ্য। তবে জিদ্দা থেকে প্রকাশিত مختارات সংগ্রহ করতে পারলে অনেক সহজ হবে। من روائع الطنطاوي -ও অনেক ভালো। অল্পতেই এখানে শায়খের চমৎকার লেখাগুলো একসাথে পাওয়া যাবে।
সবশেষে যার কথা বলবো তার সাহিত্য শুধু সাহিত্য নয় আমি বলি জাগরণী সাহিত্য। যিনি আরবী ভাষার জন্য নিবেদিত প্রাণ। যিনি আরবী সাহিত্য থেকে পেয়েছেন অনেক কিছু, আবার আধুনিক আরবী সাহিত্যকে দিয়েছেনও অনেক কিছু। সাহিত্যকে ইসলামী সাহিত্যে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ভমিকা রেখেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক ইসলামী সাহিত্য সংস্থা গঠনে রেখেছেন অনন্য ভমিকা। তিনি আর কেউ নন তিনি আমাদের আলী মিয়া’, আবুল হাসান আলী নদভী রাহ.। তাঁর অনেক কিতাব উর্দূ থেকে আরবীতে অনুদিত হয়েছে। হয়েছে অনেক আলোচনার অনুবাদ। এসমস্ত কিতাবগুলো ছাড়া তাঁর নিজের লিখিত সমস্ত কিতাবগুলোই আরবী শেখা এবং লেখায় অনেক সহযোগিতা করবে। তাঁর রচিত সাহিত্যের কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। আরব আজম উভয় স্থানেই সমানভাবে সমাদৃত। তাঁর লেখার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তা সুখপাঠ্য এবং সহজ ও সাবলীল। সাথে সাথে এতো চমৎকারভাবে তিনি সমার্থক শব্দের সমাহার ঘটিয়েছেন যার নযীর অন্যান্যদের লেখায় বিলুপ্ত প্রায়। তাঁর লিখিত গ্রন্থগুলোর মাঝে ماذا خسر العالم بانحطاط المسلمين، الطريق إلى المدينة، من نهر كابل إلى نهر اليرموك বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও শিশু সাহিত্যে القراءة الراشدة، قصص النبيين অনন্য।
তাঁর কিতাবগুলো একটু ভেবে চিন্তে আস্তে আস্তে (القراءة المتأنية) পড়ার অনুরোধ করছি। এতে করে শব্দভাণ্ডার তৈরি হবে আর সহজেই কীভাবে ভাব প্রকাশ করতে হয় তা শেখা যাবে। অন্যদিকে তিনি যেহেতু একজন প্রসিদ্ধ চিন্তাবিদ ও মুফাক্কির, তাই তাঁর লেখা গ্রন্থ ও বক্তৃতা সংকলন অধ্যয়নে চিন্তার গভীরতা ও প্রখরতা আসবে এবং যেকোনো ক্ষেত্রে পরিশীলিত চিন্তা করার অভিজ্ঞতা তৈরী হবে। সাহিত্যে নৈতিকতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ বলে একটি বিষয় আছে, তা তিনি সকলের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন। অনারবদের মধ্য থেকে আরবী ভাষায় তার মত ভমিকা আর কেউ রাখতে পারেনি। এ কথা পণ্ডিতজনের, এ কথা সকলের।
এবার কাব্য গ্রন্থ নিয়ে কিছু আলোচনা করছি।
উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ইবনে তাম্মাম এবং বাহতারী রচিত الحماسةআবু হেলাল আছকারী রচিত ديوان المعاني আলী রা.-এর কাব্যসমগ্র ديوان علي এবং ইমাম শাফেয়ী রহ.-এর ديوان الشافعي কবিতার জন্য যেমন প্রসিদ্ধ, তেমনি আখলাক-চরিত্র, চিন্তা-চেতনার পরিশুদ্ধির ক্ষেত্রেও চমৎকার অবদান রাখে। আর কবির জন্য এ দুটি জিনিস অর্থাৎ চরিত্র ও চিন্তার পরিশুদ্ধতা অত্যন্ত জরুরি।
কাব্যগ্রন্থের মাঝে আল-বারুদী এর নির্বাচিত কবিতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর প্রশংসা করেছেন অনেকেই। বিশেষত মুস্তফা সাদেক আররাফেয়ী এর ভয়সী প্রশংসা করেছেন। অন্যান্য সমস্ত مختارات বা নির্বাচিত কবিাতসমগ্র থেকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আধুনিক কাব্যগ্রন্থের মধ্যে شوقيات বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হাফেজ ইবরাহিম আরবী ভাষার স্বীকৃত পণ্ডিত। ছোট সময় থেকেই আরবী ভাষার প্রতি ছিলেন প্রচণ্ড আগ্রহী। তার ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে যে আরবী ভাষা ও সাহিত্যে এমন কোনো কিতাব নেই যা তার পড়া হয়নি।
"فانه لم يوجد كتاب في اللغة أو الأدب ولا ديوان شعر إلا وقد طالعه. "
আবুল আলা এবং মুতানাব্বির মৃত্যুর পর তাদেরকেই আরবের সাহিত্যক বলা হতো। আর তাদের মৃত্যুতেই বলা হয়- আরবী সাহিত্যেরও মৃত্যু হয়েছে।
"إن هذين الشاعرين كانا أشعر أهل الشرق العربي، منذ مات المتنبي وأبو العلاء، وأنهما كانا ختام حياة أدبية طويلة باهرة، بدأت في نجد وانتهت في القاهرة."
তাই তার দিওয়ান অধ্যয়নে সমাজ, রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি সব বিষয়ের ভাব প্রকাশের এবং নীরবে প্রতিবাদের কত সুন্দর ভাষা হতে পারে তা জানা যাবে।
উপরোল্লিখিত কিতাবসমূহ অধ্যয়নে পাঠকের একটি সাহিত্য রুচি তৈরি হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। সাথে সাথে তাদের লেখার অনুকরণ করে লিখতে শুরু করলে লেখার প্রতি আরো সাহস বাড়বে। এবং একসময় লেখালেখি ও সাহিত্যে নিজস্ব একটি অবস্থান, নিজস্ব ঢং তৈরি হবে। যদিও শুরুটা দেখা যাবে একটু কঠিন। আর সবকিছুর শুরুটা একটু কঠিনই হয়- এ কথা সকলেরই জানা। তবে সাধনা ও অধ্যবসায় চেষ্টা-প্রচেষ্টার পর শুধু উন্নতি আর উন্নতি দেখতে পাবে। প্রতিভার বিকাশ ঘটতে থাকবে। এবং আল্লাহ চাহেন তো সাহিত্যের ময়দানে একটি দৃঢ় অবস্থান তৈরি হবে।
এক্ষেত্রে মুস্তফা সাদেক আররাফেয়ী-এর একটি নছীহত হলো তোমার হাতের নীচে যা পাবে তাই পড়ে ফেলো।অধিক পরিমাণ অধ্যয়নের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার জন্যই তিনি একথা হয়তো বলেছেন। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই তা যেন সুসাহিত্য হয়। আর সাথে সাথে আদীব হুযুর দামাত বারকাতুহুম-এর নসীহত অনুযায়ী এ অধ্যয়ন একজন বিশেষজ্ঞ মুরব্বীর তত্ত¡াবধানে হওয়া অবশ্যই বাঞ্ছনীয়। অন্যথায় যে কোনো সময় হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এসমস্ত গ্রন্থ অধ্যয়নের সাথে সাথে কিছু আরবী প্রবাদ প্রবচন, কবিতা মুখস্থ করে নেয়া উচিত। আর কুরআনে কারীমের আয়াত ও হাদীছে রাসূল মুখস্থ করার কোনো বিকল্প আছে বলে আমার জানা নেই।
নিজের লেখাকে শক্তিশালী করার পেছনে আরেকটি চমৎকার পদ্ধতি রয়েছে। যার অনুস্মরণ করেছেন মুস্তফা সাদেক আররাফেয়ী এবং আলী তানতাবী-এর মত সাহিত্যিকরা। আর তা হল, একটি ছোট অনুচ্ছেদ নির্বাচন করে তা কয়েকবার পড়া। একবার, দুবার এবং কয়েকবার। এরপর এর অনুকরণে লেখা। একবার, দুবার এবং কয়েকবার। এভাবে লিখতে লিখতে একসময় লেখা নিজের আয়ত্তে চলে আসবে।
তবে এক্ষেত্রে একটি বিষয় বলে রাখা প্রয়োজন, তা হচ্ছে সাহিত্যচর্চার পূর্বে ভাষাটা শিখতে হবে সঠিকভাবে, শুদ্ধভাবে। ভাষা শেখা ছাড়া সাহিত্যচর্চা করা যায় না। এর গুরুত্ব বুঝাতে উস্তাযে মুহতারাম শায়েখ শহীদুল্লাহ ফজলুল বারী দামাত বারাকাতুহুম মাসিক আলকাউসারেই একটি চমৎকার ও মুফীদ প্রবন্ধ লিখেছেন।
আসলে এ বিষয়ে আলোচনা অনেক দীর্ঘ। প্রয়োজন ধৈর্য, কঠিন অধ্যবসায়। তাহলেই সফলতা এক সময় হাতছানি দিবে। বিশিষ্ট সাহিত্যিক মুস্তফা সাদেক রাফেয়ী তাঁর ঐতিহাসিক পত্রাবলিতে বলেন,
"و رأس هذا الأمر بل سر النجاح فيه أن تكون صبورا وأن تعرف أن ما تستطيع الرجل لا يستطيعه الطفل إلا متى صار رجلا، وبعبارة صريحة إلا من انتظر سنوات كثيرة"
আর কবির ভাষায়
"وقل من جد في أمر يحاوله
واستعمل الصبر إلا فاز بالظفر "
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কুরআন ও হাদীসের এই ভাষাকে সঠিকভাবে শেখা ও আত্মস্থ করার তাওফীক দান করুন। দ্বীন ও উম্মাহর কল্যাণে এই ভাষায় সাহিত্য চর্চা করার হিম্মত ও কুওয়ত দান করুন। আমীন। 

লেখক: মুহিউদ্দিন ফারুকী,
গবেষক, আরবী ভাষা ও সাহিত্য

পরিচালক: আরবী ভাষা ও সাহিত্য কেন্দ্র, বাংলাদেশ

The word of Shaykhul Azhar about Corona victim

সামর্থ্যবান প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ওয়াজিব তাদের কিছু ব্যয়ভার বহন করা যারা এই রোগে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ক্ষতিগ্রস্থ লকডাউনে ঘরে আটকা পড়ার কারণে হ...