Saturday, June 2, 2018

কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কিছু কথা

কয়েক দফা গুলির শব্দ শুনে যখন স্বামীর মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত তখনও মেয়েদের শেষ আশাটুকু বাচিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলেন মা। অডিওর শেষদিকে শোনা যায় তিনি শান্ত হয়ে বুঝাচ্ছিলেন "তোমার আব্বুর কিছুই হয়নি"।
বাবাও মেয়ের সাথে শেষ কথা বলার সময় বলছিলেন "বেশিক্ষণ লাগবে না, আমি চলে আসবো আম্মু"। কিন্তু শেষ আশাটুকু আর বেচে থাকেনি। তাহিয়া ও নাহিয়ানের বাবা আর ফিরে আসেনি।

এই হত্যাকান্ডের সবচেয়ে নির্মম ও ভয়ংকর দিকটি হল, প্রশাসন যে একরামুল হককে হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল সেটা তাকে বুঝতে না দিয়ে কিসব জায়গা জমি বিক্রির কথা বলে র‍্যাব অফিসে ডেকে নেয়া। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হ্নীলার মত নির্জন এরিয়ায়। যাতে ক্রসফায়ার করতে কোন ধরণের অসুবিধা না হয়। অর্থাৎ নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের কোন সুযোগ তো দেওয়া তো দূরের কথা, তাকে ডেকে নেওয়া হয়েছে যে মেরে ফেলার জন্য এটাও বুঝতে দেওয়া হয়নি।
গতকয়েকদিনের ক্রসফায়ারে বাকিদের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর নৃশংসতার চিত্রও হয়তো অনেকটা এরকমই ছিল। অথবা হতে পারে আরো ভয়াবহ।

স্ত্রী আয়েশা বেগম সহ আত্মীয় স্বজন ও দলীয় নেতাকর্মীরা যত দৃঢ়তার সাথেই বলুক, 'একরামুল হক কোনভাবেই মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল না' ওসব কথায় কান দেয়ার সময় বা ইচ্ছা কোনটাই প্রশাসনের ছিল না। বরং র‍্যাব-৭ এর মেজর রুহুল আমিন এই হত্যাকান্ডকে বৈধ বানানোর জোরদার প্রচেষ্টাই করেছেন। তার দাবী হচ্ছে, 'একরামুল হক মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকার শীর্ষে ছিল। টেকনাফ থানায় তার নামে একটি মাদক সংক্রান্ত মামলা রয়েছে'।

কিন্তু থানায় খোজ নিয়ে জানা যায়, একরামুল হকের নামে যে দুটি মামলা ছিল, তার একটি ২০০৮ সালে আদালত খারিজ করে দেয়। আর মাদক সংক্রান্ত মামলাটিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, একরামুলের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও আরো একটু যোগ করে বললেন, কাউন্সিলর একরাম মাদকের সাথে জড়িত থাকার ব্যাপারে নাকি আগেও কয়েক জায়গায় লেখালেখি হয়েছে। তো "কয়েকজায়গার লেখালেখি"কে দলিল হিসেবে গ্রহণ করে মন্ত্রীরাও আজকাল মানুষ হত্যার বৈধতা দিতে শুরু করেছে!

আসলে প্রশাসন হোক অথবা সরকার, কেউই যে এখন আর বিচারবিভাগের উপর আস্থা রাখতে পারেন না চলমান রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ বহন করে। এরউপর আবার প্রধান বিচারপতির সাথে ঘটানো সেই স্ক্যান্ড্যাল ফাস হওয়ার ব্যাপারটা তো আছেই। তাই এই অবস্থায় যদি শত্রুকে অপরাধী সাব্যস্ত করার দায়িত্ব বিচারবিভাগের হাতে তুলে দেওয়া হয় তাহলে বড় বড় রাঘববোয়ালদের ফাসিয়ে দিয়ে মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত করে দেয় কিনা সে ভয়টা থেকেই যায়। যে কোন মূল্যে 'বোয়ালমাছ'দের বাচিয়ে রাখতে হবে যে!

আচ্ছা ঠিক আছে, সরকারের ভয়ে নাহয় মেনেই নিলাম, কাউন্সিলর একরামুল হক মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। বিগত কয়েকদিনে আরো যে শতাধিক মানুষকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে তাদেরও অপরাধী বলেই বিশ্বাস করে নিলাম।
তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এই বিশ্বাসকে পাশ কাটিয়েই কিন্তু পুরো বাংলাদেশের মানুষ এখন প্রশাসনের নির্মম হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদ করছে। সরকার বিরোধী হয়ে যাবার ভয়ে হয়তো কেউ মাঠে নামার সাহস করছে না। কিন্তু যে মাধ্যমে যতটুকু প্রতিবাদের সামর্থ্য আছে ততটুকু করে মানুষ ঠিকই জানিয়ে দিচ্ছে বিচার বহির্ভূত এই হত্যাকান্ডকে জনগণ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছে।

জনগণ এখন প্রশ্ন তুলছে,
উদ্দেশ্য কি আসলেই মাদকবিরোধী অভিযান? তাহলে গডফাদারদের রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করে দিচ্ছেন কেন? কেন একের পর এক তাদেরকে বিদেশ পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে?
মাদক বিরোধী অভিযানের নাম করে মাদকের ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হচ্ছে না তো?
সময় যত যাচ্ছে প্রশ্নগুলো ততই গুরুতর হয়ে উঠছে।

Friday, March 23, 2018

যেমন ছিল ওমর রা. এর যুগে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা

মিসর বিজয়ের পর মুসলামদের রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম শুরু হয় খেলাফতে ইসলামীর প্রথম রাজধানী ফুসতাত নগরী থেকে। মূলত আলেকজান্দ্রিয়া বিজয়ের পরই মিসরে রোমানদের পতন ঘটে। এবং  আমর ইবনুল আস রা. এর একটা ইচ্ছা ছিল বন্দর নগরী আলেকজান্দ্রিয়াকে রাজধানী বানানোর। সে অনুমতি চেয়ে তিনি ওমর রা. কে পত্রও লিখেছিলেন। কিন্তু ওমর র. যখন জানতে পারলেন আলেকজান্দ্রিয়ায় অবস্থান করলে আরবের সাথে মিসরের রাজধানীর ব্যবধানটা হবে জলপথের মাধ্যমে তখন তিনি আর সে অনুমতি দিলেন না। কারণ আরবরা জলপথে যুদ্ধ করে অভ্যস্থ ছিলনা।

খলিফার নির্দেশনা অনুযায়ী আমর ইবনুল আস রা. আলেকজান্দ্রিয়া বিজয়ের পর ফুসতাত নগরীতে ফিরে এলেন। 
ফুসতাত হচ্ছে সেই জায়গা মিসর অভিযানে এসে যেখানে সাহাবায়ে কেরাম প্রথম তাবু স্থাপন করেছিল। আরবিতে তাবুকে ফুসতাতও বলা হয়। পরে এই জায়গার নামই হয়ে যায় ফুসতাত।

ফিরে এসে সর্বপ্রথম তিনি ফুসতাত নগরীতে মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দিলেন। এবং এই মসজিদকে কেন্দ্র করেই তিনি ইসলামী আদর্শে রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা তৈরী করলেন। 
বেশ গুরুত্বের সাথে মসজিদটি নির্মাণ করা হল। কেবলা নির্ধারণের দায়িত্বে ছিলেন ৮০ জন সাহাবী। তাদের মধ্যে যুবায়ের ইবনুল আউওয়াম, আবু দারদা, উবাদা ইবনে সামেত, আবু যর গিফারী রা. বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এই মসজিদকে কেন্দ্র করে হযরত আমর রা. রাষ্ট্রের দুটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
১ শিক্ষাকেন্দ্র
২ বিচারালয়

ইসলামের প্রথম যুগে মিসরের বিচার বিভাগের সার্বিক কাজ এই মসজিদ থেকেই পরিচালনা করা হত। সে আদালতের বিচারক ছিলেন রাসুলুল্লাহ সা. এর সম্মানিত সাহাবায়েকেরামগণ।

পাশাপাশি তিনি প্রথম দ্বীনী শিক্ষাব্যবস্থাও গড়ে তোলেন এই মসজিদকে কেন্দ্র করেই।
দেশ বিজয়ের পর কেন আমর রা এর কাছে দ্বীনী শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন গুরুত্ব পেল সেটা বুঝতে হলে দুটি প্রেক্ষিত জানা জরুরী।
১ যেহেতু শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মিসর রোমানদের যুগে থেকেই বেশ অগ্রগামী ছিল তাই এই ক্ষেত্রে তার মোকাবেলায় শক্তিশালী ইলমী ভিত রচনা তখন সময়ের দাবী ছিল। তাছাড়া রোমানদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে থাকা মিসরীরা মুসলমানদের আচার-সভ্যতার প্রতি শুরু থেকেই আকৃষ্ট হতে শুরু করেছিল।
২ বিজয়ের পর আরবের মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য একটি জনসংখ্যা মিসরে চলে আসে। এতে মুসলমানদের জন্যেও স্বতন্ত্র একটি শিক্ষাব্যবস্থা ও সংস্কৃতির ধারা চালু করার প্রয়োজন দেখা দেয়।
পদক্ষেপটি এই দুই প্রেক্ষিতে কতটা সাফল্য পেয়েছে সেটা ইতিহাসই বলে দিয়েছে।

মিসরের ভাষা তখন আরবি ছিল না। এবং এই পদক্ষেপের ফলে জোর করে মিসরীদের উপর আরবি চাপিয়েও দিতে হয়নি। আরবদের সংস্পর্শে এসে যে মুগ্ধতা তৈরী হয়েছিল তাতেই তারা ইসলামী তাহযীব-তামাদ্দুনকে সাদরে গ্রহণ করতে শুরু করেছে।
ইতিহাসের এই অধ্যায়ে এসে আরব মুসলিমদের উপর প্রাচ্যবিদরা ক্ষোভ ঝাড়ার জন্য দৃশ্য বেশ হাস্যকর। তারা মুসলমানদের এই সভ্যতার বিনির্মাণকে “সাংস্কৃতিক আগ্রাসন” বলে চালিয়ে দেওয়ার হীন প্রচেষ্টা করে থাকে। কারণ আমর রা. এর এই উদ্যোগে মুসলমানরা এতটাই ঈর্ষণীয় সাফল্য পেয়েছিল যা আজও দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। মাত্র এক শতাব্দি পর এসে এক চতুর্থাংশ খৃষ্টান মিশরীরা মুসলমান হয়ে যায় এবং সমস্ত মিসরীরা সাচ্ছন্দে আরবি ভাষাকে তাদের জাতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। এবং সেই ভাষা ও ধর্মের সাথে যেই আত্মিক বন্ধন তাদের তৈরী হয়েছে আজও তার দৃঢ়তা চোখে পড়ার মত।

হযরত আমর ইবনুল আস রা এর এই মাদরাসার শিক্ষক সকলেই ছিলেন রাসুলের সম্মানিত সাহাবীগণ। সে সময় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাদিসে নববীর ইলম অন্বেষণে বহু মানুষের সমাগম ঘটতো।
পাঠদানের বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল কুরআন ও তাফসির, হাদিস ও হাদিসের রেওয়ায়াত। এবং এই মাদরাসার মুহতামিম বা মুদির ছিলেন প্রসিদ্ধ সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা। তিনি কুরআন হাদিসের বিস্তর জ্ঞান লাভের পাশাপাশি তাওরাতের উপরও বেশ পান্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ সা. থেকে বহু হাদিসের বর্ণনাকারী এই সাহাবী হাদিস চর্চায় সেখানে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন একেবারে মৃত্যু পর্যন্ত। তার কবরটি আজও সেই মসজিদের পাশেই রয়েছে।

পরবর্তীকালেও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বিশ্বের বুকে অন্যতম বৃহৎ দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল জামেউ আমর ইবনুল আসের প্রাঙ্গণ।

ইমাম আল্লামা ইবনে সায়েগ হানাফীর কথা থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। উনি বলেছেনঃ আমি সাতশত উনপঞ্চাশ হিজরীর পূর্বে এই মসজিদে ইলম সাধনার অবস্থা দেখেছি। রাতের বেলায় এখানে আঠারো হাজার প্রদিপ জালানো হত। যেই কাজে প্রত্যহ ১১ কিনতার তেল ব্যয় হত।

এবং শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করা ছাড়াও সূচনালগ্ন থেকেই যেহেতু বিচার ব্যবস্থার মূলকেন্দ্র হিসেবে খলিফারা এই মসজিদকে বিবেচনা করতেন তাই একই সাথে মুসলিম সুলতান ও আলেম ওলামাদের এই মসজিদের সাথে সবসময়ই গভীর একটা সম্পর্ক ছিল।
আমর ইবনুল আস রা. এর তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত এই মসজিদ মিসরের মুসলিম সভ্যতা নির্মাণে কতটুকু অবদান রেখেছে সে নিয়ে আল্লামা সুয়ুতি রহ. তার কিতাব “হুসনুল মুহাদারা”তে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

আবুল হাসান আলী নদভী যখন ১৯৫০ সালে মধ্যপ্রাচ্যে এসেছিলেন তখন এই মসজিদে নামাজ আদায় করে বলেছিলেন “নামাজে রুহানী এক ধরণের স্বাদ অনুভূত হল। মনে হল এমন এক আকর্ষণ অনুভব করেছি যা অন্য কোন মসজিদে হয়নি”।

মসজিদটি তখন একেবারেই সাদাসিধে ধরণের ছিল। এবং কিছুটা অবহেলিত দেখে আলী মিয়া নদভী বেশ কষ্ট পেয়েছিলেন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মালিক ফারুক জুমাতুল বিদা আদায় করতেন বলে ব্যবস্থাপনা কমিটি এর কিছু যত্ন নিত। আজ সত্তর বছর পরে এসেও অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন ঘটেনি। পুরাতন মিসরে এর অবস্থান হওয়ার কারণে মসজিদের বাইরের পরিবেশ এখনো বেশ অবহেলিত। তবে ভেতরে ঢুকে নামাজ পড়ার পর এখনো ইবাদাতের যে প্রশান্তি অনুভূত হয় সেটা সত্যিই ভাষায় বর্ণনা করার মত নয়।

-আশরাফ মাহদি
শিক্ষার্থী - আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়

Friday, March 16, 2018

মুসলমানদের মিসর বিজয় ও নববী আদর্শের কিছু শিক্ষা

হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর যুগে মিসর ইসলামী খেলাফত ব্যবস্থার অধীনে আসে। এর আগ পর্যন্ত মিসরে রোমান শাসকদের রাজত্ব ছিল। রোমানদের পূর্বে শাসক ছিল টলেমীয় আলেকজান্ডারগণ। তাদের আগে ছিল পারসিক এথনীয়গণ। তাদের আগে গ্রীক শাসকগণ। এবং তাদেরও আগে শাসন করেছে ফেরাউনরা। প্রায় পাচ হাজার বছর ধরে ইতিহাসের সব ক্ষমতাধর মহানায়কেরা নিজেদের সভ্যতা কায়েম করেছে মিসরের মাটিতে। এবং সেকালের বহু নিদর্শন মিসর এখনো ধারণ করে রেখেছে। হাজার হাজার বছরের সেসব ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে থাকতে পেরেছে বলেই আজও মিসর এক রহস্যময় আকর্ষণ নিয়ে টিকে আছে।

ফেরাউনদের যুগেরও প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর পর মিসরে মুসলমানদের আগমণ ঘটে। বিশ্বের দুই পরাশক্তি রোম-পারস্যকে কুপোকাত করে মিসর অভিযানে এসেছিল আমর ইবনুল আসের বাহিনী। সে সময় মুসলমানদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ঠিক কতখানি বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং প্রাচ্যবিদদের ভাষায় বলতে গেলে, "পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য সব দেশ বিজয় করে মুসলমানরা কতটা "হিংস্র" হয়ে উঠেছিল" সেসব বুঝার জন্য  মুসলমানদের মিসর বিজয়ের প্রেক্ষাপট জানাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সময় তখন ৬৬১ খৃষ্টাব্দ। হযরত ওমর রা. এর খেলাফতকাল। তিনি সিরিয়া বিজয়ের পর সেনাপ্রধান আমর ইবনুল আস রা. কে ৩৫০০ সৈন্য বাহিনীসহ মিসর অভিযানে পাঠান। মুসলমানরা তখন মিসরে প্রবেশ করেছিল সিনাই অঞ্চল দিয়ে। যেটি একালে এসেও মিসরের সীমান্তের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল বলে বিবেচিত হয়।

সেনাপ্রধান আমর ইবনুল আস রা. আলেকজান্দ্রিয়া থেকে কিছু দূরে সর্বপ্রথম তাবু স্থাপন করে সেনানিবাস তৈরী করললেন। তাবুর সেই নগরীকে ফুসতাত বলা হত।
আলেকজান্দ্রিয়া তখন প্রায় ১৫০০ বছরের পুরোনো রাজধানী।

ওদিকে মুসলমান সৈন্যদের আগমনের খবর পেয়ে আলেকজান্দ্রিয়ার শাসক মুকাওকাস দুইজন গণ্যমান্য ক্যাথলিক নেতাদের পাঠান হযরত আমর রা. এর সাথে সাক্ষাত করতে। এরপর আমর রা. তাদের সাথে যেই আচরণ করলেন তা ছিল জীহাদের পূর্বে প্রতিপক্ষকে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার সুযোগ উন্মোচন করার নববী আদর্শের নমুনা। কারণেই প্রথমেই হেদায়েতে দাওয়াত ও তা গ্রহণ না করলে কর প্রদান করে সন্ধিচুক্তি প্রস্তাবনার নির্দেশ জীহাদের অভিযানে পাঠানোর পূর্বে রাসুলুল্লাহ সা. সাহাবীদের করেছেন বলে বিভিন্ন হাদিসে উল্লেখ আছে।

আমর রা. প্রথমে পাদ্রিদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। বেশ নম্রতার সাথে দাওয়াত দেওয়ার পর তাদের নিকট দুইটি প্রস্তাব রাখলেন:

১ যে ব্যক্তি আমাদের দাওয়াতকে গ্রহণ করবে সে আমাদের মধ্যে একজন বলেই গণ্য হবে।
২ আর যে ব্যক্তি দাওয়াতকে গ্রহণ করবেনা আমরা তার প্রতি কর প্রদানের প্রস্তাব পেশ করবো। এবং তার প্রতিরক্ষা দায়িত্ব গ্রহণ করবো।

ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য তাদেরকে তিনদিন সময় দেওয়া হল। এবং পাদ্রিরা আরো একদিন বাড়িয়ে, মোট চারদিন সময় চেয়ে নিয়ে ফিরে গেল।

পাদ্রিদের মুখ থেকে সবকিছু শুনে মুকাওকাস সকলকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার হুকুম দিল। কিন্তু যখন তারা ভেবেচিন্তে দেখলো মুসলমানদের সাথে সম্মুখযুদ্ধে পেরে ওঠার কোন সম্ভবনাই নেই তখন তারা জনগণকে চোরাগোপ্তা হামলার প্রতি উৎসাহিত করতে লাগলো।  তবে জনগণ ততক্ষণে বাস্তবতা উপলব্ধি করে ফেলেছে। তারা মুকাওকাসের হঠকারী সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করে জানিয়ে দিল "যে বাহিনী সবেমাত্র বিশ্বের দুই পরাশক্তি পারস্য(ইরান) এর কিসরা ও রোমের কায়সারকে হারিয়ে মিসর বিজয়ের অভিযানে এসেছে তাদের সাথে যুদ্ধে যাওয়াটা বোকামি ছাড়া আর কিছুই না। আমরা সন্ধিচুক্তি করতে চাই"।
এরপরও রাজা মুকাওকাসের একনিষ্ঠ কিছু অন্ধ অনুসারী তখন মুসলমানদের উপর হামলা করার দুঃসাহস দেখাতে গিয়ে সদলবলে করুণভাবে নিহত হয়েছিল।

চতুর্থ দিন কথা অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কাউকে আসতে না দেখে মুসলমানরা যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে আইনে শামস কুয়াটি ঘেরাও করে। আইন শামস হল সেই অঞ্চল যাকে এখন মানুষ কায়রো বলে চেনে। তবে কায়রো নগরী তখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
মুসলমানরা কেবলমাত্র কুয়া ঘেরাও করার পরই আইনে শামসের রাজা এর ভয়াবহতা টের পেয়ে যায়। সাথে সাথে সে আমর ইবনুল আস রা. এর দরবারে এসে সন্ধি চুক্তি করে ফেলে। এবং তাদের দেখাদেখি আলেকজান্দ্রিয়ার রাজা মুকাওকাসও সন্ধিচুক্তি করে ফেলে। তবে অনেক ইতিহাসবিদরা বলেছেন আলেকজান্দ্রিয়া বিজয় করতে আমর রা. কে সংক্ষিপ্ত একটি যুদ্ধের অভিযান পরিচালনা করতে হয়েছিল। এছাড়া পুরো মিসরই বিনাযুদ্ধে সন্ধিচুক্তি মেনে নিয়েছিল।

আমর ইবনুল আস রা: তখন  সন্ধিনামায় লিখেছিলেন:
"এই হচ্ছে মিসরবাসির প্রতি আমরের নিরাপত্তানামা। তাদের কোন ধর্মীয় স্থাপনায় হস্তক্ষেপ করা হবেনা। ধর্মীয় এবং নাগরিক কোন সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেনা। এই সন্ধিনামায় যারা একাত্মতা প্রকাশ করবে তারা কর আদায় করবে।"

এভাবেই উভয় ধর্মের লোকদের ধর্মীয় সহাবস্থান মেনে নেওয়ার মাধ্যমে সেই যুগে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সূচনা হয়েছিল তা মিসরে আজও বহাল আছে। জনসংখ্যার পঁচাশি ভাগ মুসলমান হলেও পনেরো ভাগ খৃষ্টানদের সাথে তাদের অসাম্প্রদায়িক আচরণের কোন নজির নেই।

মুসলমানদের এ ধরণের বিজয় প্রমাণ করে শত্রুর ভেতরে আল্লাহ তায়ালা সে যুগে মুসলমানদের কি পরিমাণ প্রভাব সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। কিসরা কায়সারের সাম্রাজ্য ধুলিস্যাত করে মুসলমানদের যে প্রতাপ তৈরী হয়ে গিয়েছিল এতে মুসলমানরা পারতো কোন সুযোগ না দিয়ে সরাসরি যুদ্ধ লিপ্ত হতে। কিন্তু নববী আদর্শ থেকে তারা সেই সময়ও একচুল এদিক সেদিক নড়েননি। প্রথমে হেদায়েতের দাওয়াত দিয়েছেন। দাওয়াত গ্রহণ করতে না চাইলে নিজ ধর্মে বহাল থেকেও শুধু মাত্র কর আদায় করে সন্ধি চুক্তির সুযোগ প্রদান করেছেন। তারা চাইলেই পারতেন এই মিসরবাসীকে তখনই তরবারির জোর দেখিয়ে মুসলমান বানিয়ে ফেলতে। অথবা কালিমা না পড়ার অপরাধে জবাই করে কতল করে ফেলতে।
কিন্তু তারা তো এসবের কোনটাই করেন নি। কোন ধরণের রক্তপাত ছাড়াই কেবলমাত্র সন্ধিচুক্তির মাধ্যমে একটি দেশকে ইসলামী খেলাফত ব্যবস্থার ছায়াতলে তারা নিয়ে এসেছিলেন। মুসলমানদের দেড় হাজার বছর পুরোনো একটি দেশ বিজয়ের ঘটনা আজকের প্রেক্ষাপটেও আমাদের জন্য কতটা শিক্ষণীয় হয়ে আছে।

-আশরাফ মাহদি
শিক্ষার্থী - আলআযহার ইউনিভারসিটি

Friday, January 26, 2018

হদ ও তাযীরের পার্থক্যঃ তাযীরের শিথিলতা কি এলিটিজমকে উৎসাহিত করে?

যে সমস্ত গুরুতর অপরাধের শাস্তির পরিমাণের ব্যাপারে কুরআন হাদিসের বক্তব্য সুস্পষ্ট ও নির্ধারিত সে সব শাস্তিকে শরিয়তের পরিভাষায় হদ ও কিসাস বলা হয়।
আর তাযীর হল সেই সব সাধারণ শাস্তি যা হদ ও কিসাস ব্যতীত অন্যান্য সাধারণ অপরাধের কারণে দেয়া হয়ে থাকে। শরিয়ত তাযীরের কোন পরিমাণ নির্ধারিত করে দেয়নি। এবং এই লঘু অপরাধের শাস্তির ব্যাপারে হাদিসে ক্ষেত্রবিশেষ কিছুটা শিথিলতা এসেছে।  ইসলামে সাধারণ অপরাধের জন্য যেই শাস্তির কথা বলা হয়েছে তাঁর ব্যাপারে হাদিসে স্পষ্টই এসেছে যে তা দশ বেত্রাঘাতের বেশি যাতে কোন ভাবেই না হয়। এমনকি কোন শাসক বা বিচারকও যদি তাযিরের ক্ষেত্রে হদের সমপরিমাণ শাস্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেয় তাহলে হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী সে মু'তাদীন বা সীমালঙ্ঘনকারী সাব্যস্ত হবে।

তাযীর সংক্রান্ত অন্য এক হাদিসে সম্মানিত ব্যক্তিদেরকে তাদের লঘু অপরাধের শাস্তির ক্ষেত্রে শিথিলতা প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে।
আবু দাউদ ও তাবারানীরতে বর্ণিত মারফু হাদিস, আকিলু যাবিল হাইয়াত আসারাতিহিম, ইল্লাল হুদুদ।
অর্থাৎ সাধারণ শাস্তির ক্ষেত্রে সমাজের মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করা হবে তবে হদের ক্ষেত্রে নয়। হাদিসের সনদের বর্ণনাকারীগণ সকলেই সিকাহ বা নির্ভরযোগ্য।

তাহলে কি ইসলাম সম্মানিত মানুষদের জন্য শিথিলতা প্রদর্শন করে এলিটিজমকে উৎসাহিত করলো? অনেকে এই ভুল ব্যাখ্যায় গিয়ে ইসলামে এলিটিজম খুজে পেতে পারেন।
এই হাদিস থেকে নেয়া হুকুম থেকে কোনভাবেই এই কথা বুঝে নেয়ার সুযোগ নেই যে ইসলাম এলিটিজমকে উৎসাহ দিল। একটা কথা মনে রাখতে হবে ধর্মীয় কারণে সমাজে মর্যাদাবান ব্যক্তি আর দুনিয়াবী মর্যাদাবানের হিসেব এক নয়। নৈতিকতার বিচারে অবশ্যই তাকে শতভাগ ন্যয়ের উপর থাকতে হবে। আজকাল প্রসিদ্ধি পেয়ে বসাটাই যে সমাজের মর্যাদাবানের মাপকাঠি হয়ে দাড়িয়েছে এই ধারণা থেকে বের হয়ে এসে এই হাদিসের অর্থ বুঝতে হবে।
যারা ধর্মীয় ভাবে সমাজে মর্যাদাবান হন তারা সেই সমাজের মুকতাদা বা অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে থাকেন। অতএব তাদের সাধারণ কোন অপরাধের ব্যাপারে যদি শীথিলতা প্রদর্শন করে তাদের দোষকে গোপন রাখা যায় তাহলে তাঁর ইতিবাচক প্রভাবের বিষয়টিই যৌক্তিক। কেননা সাধারণ মানুষ তখন এই কথা বলে বেড়াতে পারবেনা যে “আরেহ, কত বড় বড় মানুষকে দেখলাম এসব করে বেড়ায়, আমরা আর  কোন ছার”


তাই সবক্ষেত্রে সমতার বিচার দেখাতে গিয়ে যদি নূন্যতম কারণেও একজন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সাধারণ সমাজের সামনে দাড় করানো হয় তাহলে এটা নিঃসন্দেহে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করবে। সমাজের ভারসাম্য রক্ষার্থেই ইসলাম এখানে বড় কোন কল্যাণের নিমিত্তে ছোট একটি বিষয়ে শিথিলতা প্রদর্শন করেছে।

Tuesday, November 14, 2017

প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ নিয়ে সরকার দলীয় নেতাদের বক্তব্য

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমঃ
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এস কে সিনহা) স্বেচ্ছায় ছুটি নিয়েছেন এবং তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগও করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।
প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ নিয়ে বিএনপি মিথ্যাচার করছে উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো চাপ কিংবা উৎসাহ ছিল না। বিএনপি মিথ্যাচারে অভ্যস্ত, এটা তাদের সংস্কৃতি, তাই প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ করা নিয়ে সর্বত্রই মিথ্যাচার করছে। এটা তাদের চরিত্রে বহিঃপ্রকাশ।

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফঃ
প্রধান বিচারপতি যেভাবে চেয়েছেন, সেভাবেই উনি অবসরে গিয়েছেন। এখানে আমাদের কারও বলার কিছু নেই বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম।
আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেছেন, ‘প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা সাহেব অসুস্থ ছিলেন। মিডিয়ার মাধ্যমে জেনেছি, উনি সর্বশেষ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিয়েছেন। এবং সেখান থেকে কানাডায় গিয়েছেন। ওনার বরাত দিয়ে মিডিয়াতেও এসেছে, সিঙ্গাপুরে উনি ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত, প্রধান বিচারপতি এযাবৎকাল উনি যে অসুস্থ, যেটা মিডিয়াতে বহুবার এসেছে, এটাই সত্য।
হানিফ অভিযোগ করে বলেন, ‘একটা অসুস্থ মানুষকে সুস্থ বলে দাবি করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে বিএনপি শুরু থেকেই মিথ্যাচারে লিপ্ত ছিল।

সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরঃ
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বিএনপি বলে, প্রধান বিচারপতিকে আমরা নাকি জোর করে পদত্যাগ করিয়েছি। প্রধান বিচারপতি কোথা থেকে আজ পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন? সিঙ্গাপুর থেকে। সিঙ্গাপুরে কি পুলিশ বাহিনী অথবা কোনো স্পেশাল ফোর্স ছিল যে তাঁকে জোর করে পদত্যাগ করিয়েছে? এটা বিশ্বাস করেন আপনারা? আপিল বিভাগের বিচারকেরা অলরেডি রাষ্ট্রপতিকে বলেছেন, তাঁর সঙ্গে আমরা কাজ করব না। সরকারের এখানে কী দোষ, আমি জানতে চাই।
আজ শনিবার বিকেলে গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ মাঠে গাজীপুর মহানগর ও জেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে নতুন সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন কার্যক্রমের উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত এক জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ওবায়দুল কাদের এ কথা বলেন।

সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি সাড়ে আট বছরে সাড়ে আট মিনিটের জন্যও রাস্তায় নামতে পারেনি। বাইরে আন্দোলনের ডাক দিয়ে নেতারা এয়ারকন্ডিশন ঘরে বসে হিন্দি সিরিয়াল দেখেন। বিএনপির নেতারা হিন্দি সিরিয়াল দেখেন, আর মোবাইলে খবর নেন পুলিশের গতিবিধি কী। এই হচ্ছে বিএনপি।

Monday, November 13, 2017

ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়নে ক্রমধারার অপরিহার্যতা


কনসেপ্ট অব গ্রাজুয়্যলিটি হলো একটি সহজ কিন্তু গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর। এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও তাত্ত্বিক বিষয়। আমি এই প্রশ্নের এক ধরনের জবাব দিয়েছি এবং যে কেউ এর কোনো সম্ভাব্য ও যুক্তিসংগত উত্তর দিতে পারে।

আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্য সম্পূর্ণ করে দিয়েছি এবং আমার নিয়ামত তোমাদের প্রতি পূর্ণ করেছি আর তোমাদের জন্য ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে কবুল করে নিয়েছি।’ [সূরা মায়েদা: ৩]

বিদায় হজ্বের সময়ে পবিত্র কোরআনের এই আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বে দ্বীন বা জীবনাদর্শ হিসেবে ইসলাম কি কমপ্লিট ছিল না? ‘… আজ পরিপূর্ণ করা হলো …’ এর মানে নয় কি যে বিষয়টি ইতোপূর্বে কমপ্লিট ছিল না?

যদি তাই হয়, অর্থাৎ তৎপূর্বে তা পূর্ণ বা কমপ্লিট না হয়ে থাকে তাহলে এর প্রাথমিক পর্যায়ে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁরা কি অ-পূর্ণ ইসলামের উপর মৃত্যুবরণ করেছেন? আর যদি বলা হয় যে তাঁদের ইসলাম পূর্ণ ছিল অথচ তখনও ইসলামী বিধি-বিধান প্রবর্তন সমাপ্ত বা সুসম্পন্ন হয় নাই! তাঁরা তাঁদের সময়কালে যতটুকু পেয়েছিলেন তা তৎপরবর্তীর তুলনায় incomplete ছিল। 

ধরা যাক, কোনো একজন আমল করার সুযোগ পেয়েছেন শতকরা ৫০ ভাগ বিধি-বিধানের। বাদবাকি ৫০ ভাগের উপর আমল করার সুযোগ পাননি। এখন ঐ ৫০ ভাগকে তাঁর জন্য ১০০ ভাগ হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে? নাকি ঐ ৫০ ভাগ এবং পরবর্তী ১০০ ভাগ এই দুইটারই equal status? হতে পারে তাঁরা যতটুকু পেয়েছেন, ধরুন তা শতকরা ৫০ ভাগ, তার বাইরের অপর অংশটুকু তাঁদের জন্যে একটা special ফেভার হিসেবে exemption করা হয়েছে। যদি তা exemption না হয় তাহলে বলতে হবে যে আসলে দুটোই মূলত একই। শুধু প্রায়োগিক বিধি-বিধানের দিক থেকে কোনোটাকে কম expand করা হয়েছে আর কোনোটাকে more expand হয়েছে। কোনো ইলাস্টিককে যেমন আমরা ৫ সেন্টিমিটার লম্বা করতে পারি, আবার সেটিকে সর্বোচ্চ ১০ সেন্টিমিটারও লম্বা করতে পারি। উভয় অবস্থাতেই সেটি একই রাবার হিসেবে থাকছে। তাই না?

তাহলে which Islam is the complete Islam? আমরা দেখি ইসলামের ৩টা মেজর phase:
(১) প্রথম ১৩ বছরে মক্কার যে ইসলাম তা ছিল মূলত কনসেপচুয়্যল এবং বিধিবিধানের দিক থেকে almost the same
(২) মদিনার প্রথম period এ বিস্তারিত বিধিবিধানের প্রবর্তন মোটামুটি শুরু হয়েছে এবং
(৩) মাদানী যুগের শেষের দিকে তা complete হয়েছে।

বিধিবিধানের দিক থেকে এই ৩টা পর্যায় স্পষ্টতই ৩ প্রকারের। যারা মক্কী বা earlier মাদানী যুগে মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁরা তো পরবর্তী সময়ে প্রবর্তিত অনেকগুলো বিধি-বিধানের উপর আমল করার সুযোগ পাননি। তৎসত্ত্বেও তাঁদের ঈমান ও ইসলাম যদি complete-ই থাকে তাহলে তাঁরা কি কোনো special sanction বা exemption পেয়েছেন? অবশ্য এমন কোনো কথা কুরআন ও হাদিসের কোথাও নাই যে ঈমান, ইসলাম বা ইসলামের কোনো দিক থেকে উনাদের জন্য কোনো special sanction ছিল।

তাহলে, ইসলাম জিনিসটা কী? রেফারেন্সের দিক থেকে দেখলে এটাকে একটা concept দিয়েই সমন্বয় করতে হবে। ‘…আল ইয়াওমা আকমালতু লাকুম দ্বী-নাকুম …’ – এই আয়াতসহ কোরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহে বলা হয়েছে দ্বীন হলো ইসলাম। হাদিসে জিবরাইলে বলা হয়েছে ইসলাম হলো কলেমা, নামাজ, রোজা, যাকাত, হজ্ব এই পাঁচটা বিষয়ের সমষ্টি। সূরা আশ শূরার ১৩নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের সেই নিয়ম-বিধান নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন যার হুকুম তিনি নূহকে দিয়েছিলেন। আর যা এখন তোমার প্রতি আমরা অহীর সাহায্যে পাঠিয়েছি। আর যার হিদায়াত আমরা ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে দিয়েছিলাম এই তাকীদ সহকারে যে, কায়েম কর এই দ্বীনকে এবং ইহাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেও না।

তাহলে দেখা যাচ্ছে মানুষের দ্বীন বা জীবন-ব্যবস্থা বরাবর একই ছিল। তাই বলা যায় যে history of Islam is the history of mankind দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষ পাঠানোর সাথে সাথে একটা জীবন বিধানও পাঠিয়েছেন। ইসলাম এই নামটা হযরত ইব্রাহীম (আ) দিয়েছেন- এই যা।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রাথমিক পর্যায়ের সাহাবীদের ক্ষেত্রে exemption-এর তত্ত্বটা খাটে না। কোরআন-হাদীসে এমন কোনো রেফারেন্স নেই। বরঞ্চ সবগুলো রেফারেন্স হচ্ছে এই মর্মে যে সবার একই মানদণ্ডে বিচার করা হবে। কাউকে বিশেষ কোনো সুবিধা বা রেয়াত দেয়া হবে না। রাসূল (স) তাঁর ফুফু সাফিয়া (রা) কে, তাঁর কন্যা ফাতিমা (রা) কে নাজাতের জন্য বেশি বেশি আমল করার কথা বলেছেন।

ইসলামের দুইটা দিক। একটা হলো এর conceptual দিক আর একটা হলো এর implementation এর দিক। concept টা হলো all the same এবং total এর মধ্যে কোনো বেশ কম করা যাবে না। Concept এ কোনো ধরনের compromise এর প্রস্তাবে রাসূল (স) দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন যে আমার এক হাতে চাঁদ ও এক হাতে সূর্য্ এনে দিলেও আমি তোমাদের (সমঝোতার) প্রস্তাব মেনে নিবো না।তাই, সূরা কাফেরুন এ যে সিঙ্গুলারিটির কথা বলা হয়েছে সেটি নিতান্তই conceptual Islam সম্পর্কিত।

অতএব, দ্বীন হিসেবে ইসলাম সর্বদাই সিঙ্গুলার। আর শরীয়াহ হিসেবে ইসলাম প্লুরাল ও ডাইভারসিফাইড। যদিও এই ডাইভারসিফিকেশনের মধ্যে একটা ইইউনিফিকেশান আছে, বাউন্ডারি আছে। মদিনা সনদ স্বাক্ষরের অব্যবহিত পরে তৎকালীন ইয়াসরিব শহরে যে শাসন-কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা লাভ করে সেটা কি ইসলামী রাষ্ট্র ছিল না? অথচ, ফতেহ মক্কার পরে যে ইসলামী রাষ্ট্র, সেটার যে চরিত্র আর রূপ, সেটার সাথে প্রথম হিজরীর তৎকালীন ইয়াসরিব নগরের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার পার্থক্য অনেক। মনে করা হয়, Islamic state is a single entity, either it is established or it is notআমার বিবেচনায়, ইসলামী সমাজ বা রাষ্ট্র কোনো single entity নয়। এর বিভিন্ন পর্যায় আছে। রাসূল (স) বিদায় হজ্বে বলেছেন যে, আমি কী আমার দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি? সাহাবীরা বলেছেন, হ্যাঁ, আপনি পেরেছেন।

Political science এ যেটাকে utopia বলা হয়, ইসলামী রাষ্ট্র কি বাস্তবায়ন-অনুপযোগী ও কল্পনাপ্রসূত এমন একটি ঐশ্বরিক আদর্শ রাষ্ট্র? এককথায়, ইসলামী রাষ্ট্র কি একটা ইউটোপিয়া? বিষয়টা ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। ইসলামিক utopia মানে সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নতির সর্বোচ্চ level যেটিতে আমরা পৌঁছার ও থাকার চেষ্টা করবো। আমরা যদি এ ধরনের কোনো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে একে টেকসই অবস্থায় নিয়ে যেতে পারি তবুও মৌলিক গুণগত দিক থেকে সেটি তৎকালীন মদিনাতে গড়ে উঠা রাষ্ট্রের মত হবে না। কারণ, সেই রাষ্ট্রের Head ছিলেন একজন prophet এবং prophet Mohammad (sm), the best prophet, The best statesmanএই অর্থে কখনোই যেহেতু আমরা সেই মানের একটা আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করতে পারব না তাই বর্তমান প্রেক্ষিতে একে একধরনের utopia বলা যায়, যদিও সেটিকেই standard ধরে আমাদের এগুতে হবে।

Gradual implementation-কে আমরা যদি special sanction হিসেবে না ধরি তাহলে আল্লাহর রাসূল (স) যেভাবে তৎকালীন আরবে ইসলাম কায়েম করেছেন আমরাও আমাদের স্ব স্ব সমাজ ও দেশে সেভাবে ইসলাম কায়েমের চেষ্টা করব। এই সহজ কথাটার একটা ব্যাপক তাৎপর্য আছে। বিধি-বিধানের দিক থেকে মদিনার আদর্শ রাষ্ট্রকে পর্যায়ক্রমে গড়ে তোলা হয়েছে। যখনই নতুন কোনো বিধান দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট পূর্ববর্তীটা রহিত হয়ে গেছে। উপরের সর্বোচ্চ লেভেলে যেতে হলে আমাদেরকে মাঝখানের পথ পাড়ি দিয়েই যেতে হবে। প্রাইমারি, সেকেন্ডারি, ইন্টারমিডিয়েট ও ফাইনাল- যতগুলো পর্যায় আছে বা ছিল এই সবগুলোকে একই ধারাবাহিকতায় পাড়ি দিয়ে উপরের লেভেলে পৌঁছতে হবে। সরাসরি jump করা যাবে না।

দেখা যাচ্ছে, ইসলাম কায়েমের একটা হলো deductive method আর একটা হলো inductive methodরাসূল (স) যেখানে রেখে গেছেন সেখান থেকে কুরআন হাদীস পুরোপুরি তথা অখণ্ডভাবে আমরা পেয়েছি। আমরা কী প্রথমেই সর্বশেষটি দিয়ে শুরু করব? আমরা যদি শুরুতেই সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিধানকে আমল করার কথা বলি তাহলে capacity’র বাইরে হওয়ার কারণে আমাদেরকে কিছু জিনিস ফেলে দিতে হবে। ফেলে দেওয়ার সময় হতে পারে যে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটা ফেলে দেয়া হয়েছে আর কম গুরুত্বপূর্ণগুলোকে তুলে নেয়া হয়েছে। আর যদি মনে করা হয়, আমরা সাধ্য মোতাবেক বহন করব। তখন যত কমই পারি না কেন যেটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটাকেই আমরা প্রথমে কাঁধে তুলে নেব এবং ক্যাপাসিটি বৃদ্ধির সাথে সাথে পুরো বোঝাটাই একদিন আপহোল্ড করে নিতে পারবো। একটা পাকা দালানের কাঠামো যেভাবে গড়ে ওঠে সেভাবেই যে কোনো সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করতে হয়, হোক তা অ-ইসলামী বা ইসলামী। আল্লাহ রাসূল (স)ও তা-ই করেছেন। নয় কি?

Gradual implementation of Islam এ যদি রাসূল (স) এর জন্য কোনো special sanction না হয়ে থাকে তাহলে এখন কেন আমরা সেটা বাদ দিব? আর যদি রাসূল (স) এর জন্য গ্রাজুয়্যলিটির বিষয়টি কোনো special sanction বা privilege হওয়ার দাবি করা হয় তাহলে নিচের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে- নবীদেরকে আমরা যদি শিক্ষক মনে করি এবং আমাদেরকে যদি ছাত্র হিসেবে মনে করি তাহলে দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে ভাল শিক্ষককে [মুহাম্মদ(স)] তাঁর সেরা ছাত্রদের [সাহাবীগণ] বোঝানো ও শেখানোর জন্য ক্রমধারা অবলম্বন করতে হয়েছে। আমরা তথা পরবর্তীদের কোনো শিক্ষক নাই অথচ ছাত্র হিসেবে আমরা অতি নিম্নমানের! এমতাবস্থায় ক্রমধারার এই সুবিধা আমাদের জন্য কেন প্রযোজ্য হবে না? আমরা এখন যে সমাজে বাস করছি এই সমাজটা যদি আন্দোলনের একটা উচ্চতর স্তরে না থেকে একটা নিম্নতর ধাপে থাকে তাহলে উচ্চতর ধাপের জন্য যা প্রযোজ্য সেসব বিধি-বিধানকে যদি আমরা সরাসরি obligatory মনে করে প্রয়োগের চেষ্টা করি তাহলে একটা category mistake সংঘটিত হবে যাতে সমাজে বিশৃংখলার সৃষ্টি হবে। যা ফিতনা ছাড়া আর কিছু হতে পারে না।

Graduality-কেও আমরা mechanically গ্রহণ বা implement করতে পারবো না। সেটাকে যথাসম্ভব rationalize করতে হবে। সাহাবীরা এমনকি জানতেনও না যে পরবর্তী stepটা কি হবে! তাঁরা mentally ক্রমাগতভাবে তৈরি হচ্ছিলেন বটে। এক পর্যায়ে ওহীর সূত্রে রাসূল (স) যা কিছু বলেছেন, তাঁরা তা মেনে নিয়েছেন। বিদ্যমান পরিবেশ ও জনমানসকে যথাসম্ভব ready করেই কোনো নতুন বিধান দেয়া হয়েছে। আমরা পুরো জিনিসটাকে একসাথে পেয়ে গেছি। এতে আমাদের সুবিধা হয়েছে, আমরা জানি যে ultimately ব্যাপারটা বা চূড়ান্ত বিধিটা কি? অসুবিধাটা হয়েছে এই, মনে করা হচ্ছে এ সবগুলো একই সাথে বা এর চূড়ান্ত স্তরটিই শুধুমাত্র আমাদের জন্য সর্বাবস্থায় obligatory

আমরা একটা mixed society-তে বাস করছি। দারুল কুফর ও দারুল ইসলামের একটা মাঝামাঝি অবস্থায় আমরা বসবাস করছি। এখানে higher level এর কোনো কোনো বিষয় আমরা easily করতে পারছি। যেমন আমরা জুমআর নামাজ পড়তে পারছি। কিন্তু ঐ level-এর জন্য প্রযোজ্য অন্যান্য কোনো কোনো বিধি আমরা মানতে পারছি না। যেমন আমরা হদ’ [দণ্ডবিধি] কায়েম করতে পারছি না। যদি সাব্যস্ত করা হয় যে, আমরা মক্কি যুগে আছি তাহলে আমরা কি জুমআ বাদ দিব? যাকাত বাদ দিব? হিজাব বাদ দিব? আমরা কি সুদ গ্রহণ করব?

বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, mixed-society-status concept-কে যদি আমরা গ্রহণ করে নেই তাহলে ব্যাপারটা এই দাঁড়ায় যে, রুখসত [সর্বনিম্ন অনুমোদিত সীমা] এবং আজীমত [সর্বোচ্চ মান]-এর ধারণাকে সামনে রেখে যেখানে আমাদের পক্ষে সম্ভব, যে বিষয়ে আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমোদিত ক্ষমতা আছে যেখানে আমরা শরীয়াহর সেই হুকুমটাকেই আমল করবো যা উচ্চতর ধাপের। আমাদের লক্ষ্য হলো যথাসম্ভব উচ্চতর ধাপে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে উন্নীত করা। শর্ত হলো সম্ভাব্য সকল উপায়ে উক্ত উন্নততর আইনকে মেনে নেয়ার জন্য সমাজকে তৈরি করা। এতে সামাজিক বিশৃংখলা সৃষ্টির আশংকা থাকে না। সামাজিক authority যেসব উন্নততর বিধানকে allow করে না সেগুলোর প্রযোজ্যতাকে আমরা নীতিগতভাবে স্বীকার করব, কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়নকে স্থগিত রাখবো। ব্যক্তিগতভাবে মক্কীযুগে এবং প্রাথমিক মাদানী যুগে যেসব ইসলামী বিধি-বিধান বলবৎ ছিল যেমন নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি বিষয়গুলোকে always মেনে চলব। ব্যক্তিগত পরিমণ্ডলে ও আওতার মধ্যে আমরা আজিমতকে follow করব কিন্তু অন্যদের জন্য, সমাজিক ও রাষ্ট্রীয় আইন হিসেবে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে আমরা রুখসাতকে allow করব। এ ক্ষেত্রে আমরা lowestকে approve করলেও মূল স্ট্রাকচারের highest নিয়মগুলোকে যুক্তিসংগত হিসেবে উপস্থাপন করা ও ক্রমান্বয়ে তা বাস্তবায়ন করার জন্য আমরা সর্বাত্মকভাবে সচেষ্ট থাকবো । এই লক্ষ্যে বিদ্যমান সমাজব্যবস্থাকে আমরা যথাসম্ভব তৈরি বা buildup করার চেষ্টা করবো। এক কথায় যাকে ইসলামী আন্দোলন বলা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখন আমরা কোন পর্যায়ে আছি? এ প্রশ্নের উত্তর নির্ণয়ের আগে ধর্ম ও ইসলাম নিয়ে কিছু বলা প্রয়োজন মনে করছি। ব্যক্তিজীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু ধর্মীয় বিষয় ও বৈশিষ্ট্য অন্তর্গত ও অপরিহার্যভাবে ইসলামের মধ্যে আছে বটে, যাকে আমরা ইবাদাত বলি। তৎসত্ত্বেও ইসলামের অপর বৃহৎ অংশ যাকে ফিকাহর ভাষায় বলা হয় মুয়ামালাত, তা ধর্মীয় চরিত্রের নয়; পুরোপুরিই বৈষয়িক। বিশেষ করে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়াদিতে ইসলামের বিধি-বিধানসমূহের সাথে ধর্ম বলতে যা বুঝানো হয় তার মিল নাই। আল্লাহ তায়ালা ইবাদতের জন্য মানুষ সৃষ্টি করেননি। এজন্য ফেরেশতারা যথেষ্ট ছিল। শুধু এ পৃথিবীকে নয়, পুরো বিশ্ব পরিচালনায় তাঁর প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আল্লাহ তায়ালা মানুষ সৃষ্টি করেছেন। এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলামকে এই দৃষ্টিকোণ হতে দেখে না।

তাঁরা মনে করে, ইসলাম অন্যতম একটা ধর্মমাত্র। হতে পারে তা উন্নততর বা শ্রেষ্ঠ ধর্ম। ইসলামকে বুঝা বা সত্যিকারের মুসলিম হওয়ার জন্য যে বিষয়গুলো জানা দরকার তার ন্যুনতম জ্ঞানও আমাদের দেশের জনসাধারণের মধ্যে নাই। তাঁরা ইলাহ এই পরিভাষাটির অর্থ বোঝে না, রব শব্দের অর্থ বোঝে না। তাঁরা কালেমা উচ্চারণ করে ঠিক মতো, কিন্তু এর মর্মার্থ বা কনসিকোয়েন্স সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখে না। মক্কার কাফের-মুশরিকেরা কালেমার যে implication পরিষ্কার করে বুঝতে পেরেছিল, আমাদের এখানে শিক্ষিত লোকেরাও সেগুলো বুঝে না। কালেমাকে তাঁরা পবিত্র একটা spell হিসেবে মনে করে। এর practical জিনিসগুলো বোঝে না। তাঁরা উলীল আমর সম্পর্কে শুনে নাই, বোঝে না। ইবাদাত সম্পর্কে কিছু ধারণা রাখলেও সমগুরুত্বপূর্ণ তাগুত’- এই শব্দটি আদৌ শোনেনি!? নরম মাটির উপরে যদি একটা structure করতে হয় তাহলে প্রথমে ভালোভাবে piling করতে হবে। সূফী-দরবেশ দ্বারা ইসলাম প্রচার হলেও এদেশে কখনো ইসলামী রাষ্ট্র ছিল না। তাই এদেশের মানুষকে ভাল করে একটা তত্ত্ব হিসেবে ইসলাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দিতে হবে, বোঝাতে হবে। concept হিসেবে ইসলাম clear হওয়ার পর তাঁদের সামনে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এজেন্ডা নিয়ে আসতে হবে।

ইসলাম নিয়ে যারা কাজ করে, ইসলামিক movement হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয় তাঁদের মধ্যেও অনেক সমস্যা আছে। এরা মনে করে যে তাঁরা নিজেরা সবকিছু ভাল করেই বোঝেন। তাঁদের দৃষ্টিতে একমাত্র সমস্যা হলো অন্যদেরকে বোঝানো, অধিকাংশ (?) মানুষকে কনভিন্স করে ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠা! অথচ, ইসলামী অনেক কনসেপ্ট ও আন্ডারস্ট্যান্ডিং নিয়ে তাঁদের নিজেদের মধ্যেই গভীর মতানৈক্য রয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা তাত্ত্বিকের বুলি কপচানোর বাইরে নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করা হয় না বিধায় বাহ্যত মনে হয়, কোনো সমস্যা নাই! কোনো কোনো সেক্টরে তাঁরা কোনো কাজই করেনি। ইসলাম তাঁদের কাছে এক সর্বরোগহরি বড়ি (panacea), কোনোমতে খেতে ও খাওয়াতে পারলেই কেল্লা ফতে! এরই ফলশ্রুতিতে তাঁরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বাদ দিয়ে শাখা-প্রশাখা নিয়ে involve হয়েছেন ও হচ্ছেন। প্রায়োগিক বিষয়ে যে ধরনের understanding দরকার তা প্রায়ই লক্ষ্য করা যায় না। ইসলামিক সংগঠনগুলোতে intellectual bankruptcy বা বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াপনা বলতে যা বোঝায় সেই জিনিসটা লক্ষ্যণীয় মাত্রায় বিদ্যমান! প্রচলিত ও জনপ্রিয় ধর্মীয় ভাবধারার মতো ইসলামী আন্দোলনের সংগঠনসমূহেও স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে যথাসম্ভব নিরুৎসাহিত করা হয়! ভাবখানা এমন, ক্ষমতা পেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে! এই হলো রাজনৈতিক ইসলাপন্থীদের স্ব-নির্মিত গোলক-ধাঁধাঁ!

এ বিষয়ে আর একটা পর্যবেক্ষণ হচ্ছে ইসলামিস্টরা সাধারণত এ দেশকে, দেশীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে, দেশের মানুষকে আপন মনে করে না, own করে না। জন-বিচ্ছিন্নতাকেও তাঁরা খারাপ বা ক্ষতিকর মনে করে না। বরং এই স্বাতন্ত্র্যকে তাঁরা উপভোগ করেন! ইসলামপন্থীদের মনোভাব হলো, তাঁরা সাধারণ (পাপী!) মানুষের (পরকালীন) মুক্তি বা নাজাতের মহান দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। এ ধরনের মানস গঠনের কারণে তাঁরা সবসময়ে superiority complexity-তে ভোগেন ও একধরনের self satisfaction feel করেন। ফলে তাঁরা মানুষের কাছে যখন যান তখন নিজেদেরকে special status-এর মনে করেন এবং মানুষও তাঁদেরকে (পারলৌকিক বিবেচনায়) একধরনের special (religious) status দিয়ে থাকে। মিউচুয়্যাল এক্সক্লুশানের ভিত্তিতে এ ধরনের একটা সেক্যুলার ফরমেট এখানে কম-বেশি প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। এই ধারণা থেকে বের হয়ে এসে সঠিকভাবে ইসলামকে বুঝতে চাইলে deductive approach of understanding Islam এর ভুল পন্থা হতে সরে আসতে হবে। মনে করা হচ্ছে, ইসলামের কোনো একটি বিধান কৌশলে বা জোর করে চাপিয়ে দিতে পারলে কিছু না কিছু ইসলাম তো কায়েম করা গেল! ইসলামকে একটা জীবন-দৃষ্টি বা আদর্শ হিসেবে না দেখে বিধি-বিধানের একটা আঁটি বা সমষ্টি হিসেবে দেখাই হচ্ছে এই ভ্রান্ত ও প্রান্তিক মানসিকতার কারণ।

ইসলামের দুটি দিক, একটা হলো Islam in its core of beliefs and personal practices যেমন কালেমা, নামাজ, রোজা ইত্যাদি ন্যূনতম বিষয়গুলো। অন্যটা হচ্ছে এর implementary aspects that are socio-cultural-economic-politically concernedএগুলোর বাস্তবায়ন, উন্নয়ন ও প্রেক্ষিত ক্রমধারায় অগ্রসরমান। এসব বিষয়ে স্থানিক ও কালিক পরিক্রমায় উদ্ভূত সমস্যা ও উপযোগী সমাধান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা কোনো কালবিশেষের নিরিখে কনক্লুসিভলি বলা সম্ভব নয়। সুন্নাহভিত্তিক মূলনীতির আলোকে এসব বিষয়ে যুগপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

প্লাটোর আদর্শ রাষ্ট্র সত্যিকারের আদর্শ রাষ্ট্র নয় এবং কখনো কোনো দেশে দার্শনিক-রাজা ছিল না। এই দৃষ্টিতে মদীনার সমাজ-রাষ্ট্র একটি বাস্তব সমাজ-রাষ্ট্র, প্লাটোনিক ইউটোপিয়া মাত্র নয়। একজন রাসূলের নেতৃত্বে একটা রাষ্ট্র সংগত কারণেই আমরা কখনো কায়েমে করতে পারবো না। এ দৃষ্টিতে মদীনার তৎকালীন রাষ্ট্র ব্যবস্থা এখন আমাদের জন্য একটা কল্পরূপ বা ইউটোপিয়া বটে! ইসলামী রাষ্ট্রর শেষ বলে কোনো কিছু নেই। এমনও দেখা গেছে যে, কোনো সাহাবী ইসলাম গ্রহণ করার পর মারা গেছেন। কোনো আমল করার সুযোগ পাননি। তাহলে ওনাকে কি বিশেষ রেয়াত দেয়া হবে, না তাঁর জন্য যা প্রযোজ্য বা সম্ভাব্য ছিল কেবলমাত্র তাঁর ভিত্তিতেই তাঁর বিচার করা হবে? ইসলামকে যেহেতু আমরা মূলত একটা কনসেপ্ট হিসেবে মনে করছি, যেহেতু তিনি কনসেপ্টটাকে পুরোপুরিই গ্রহণ করেছেন, অর্থাৎ ঈমান এনেছেন তাহলে তাঁর ইসলাম পরিপূর্ণ ছিল ধরে নেয়া হবে। আমরা কাফেরের যে সংজ্ঞাটা দিই সেটি হলো যে, ব্যক্তি জেনে-বুঝে ইসলামকে গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকেছে, regret করেছে।

Mixed society’র কনসেপ্ট অনুসারে আমরা যে সমাজে আছি দেখা গেল, কোনো দিক থেকে তা primary level-এর, আবার অন্য কোনো দিক থেকে তা intermediary level-এর অথবা advance level-এর। তাহলে আমরা কোন্ course of actionকে ওভারঅল ফলো করব? আমাদের পক্ষে যেসব rules-regulationগুলো adopt করা সম্ভব হচ্ছে সেসব rules-regulationগুলোকে আমরা adopt করব। বিদ্যমান সামাজিক-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে থেকে যেখানে আমাদের যেটা করা সম্ভব সেটি করবো, আপাতত ততটুকুই প্রযোজ্য মনে করব। যেটি করতে পারছি না সেটি করার অনুমোদন দেয়ার জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রকে প্রভাবিত, পরিচালিত ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে [গণতান্ত্রিক অথবা অন্য কোনো সম্ভাব্য উপায়ে] বাধ্য করবো। এ কাজে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও যৌক্তিকতাকে সর্বদা মেনে চলতে হবে। বুঝতে হবে, সমাজের মূলধারার সম্পৃক্ততাই হলো জিহাদ ও ফিতনার মাপকাঠি।

সমাজের মূলধারার সম্পৃক্ততা থাকা বা না থাকাই নির্ধারণ করবে গৃহীত কোনো বিশেষ কর্মধারা জিহাদ নাকি ফিতনা? জিহাদ ফরজ, ফিতনা হারাম। ব্যক্তি বিশেষ, একা একা জিহাদ করতে পারে না। দল বিশেষও জিহাদ করতে পারে না। এমনকি তা ইক্বামতে দ্বীনের কোনো সংগঠন হলেও! বৈধ প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক জিহাদ ঘোষণা ও পরিচালনা বাধ্যতামূলক। এ ধরনের কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতিতে প্রত্যেকের আত্মরক্ষার অধিকার সর্বদাই বলবৎ থাকে। এ ধরনের আত্মরক্ষামূলক ও ব্যক্তিগত প্রতিরোধে কেউ মারা গেলে প্রতিরোধকারী শহীদি মর্যাদা লাভ করবেন। যদিও এই সংঘর্ষ জিহাদ হিসেবে গণ্য হবে না। যেভাবে কোনো দূর্ঘটনায়, দুরারোগ্য ব্যাধিতে ও সন্তান প্রসবের সময় কেউ মৃত্যুবরণ করলে শহীদি মর্যাদা লাভ করবেন।

রাসূল (স) সর্বশেষে যা করতে বলেছেন তা হলো আমাদের জন্য উন্নততর আদর্শ ও মান এটি হলো একটা ধারণা। আর রাসূল (স) সর্বশেষে যা করতে বলেছেন আমাদের জন্য সেটি একমাত্র করণীয় এটি হলো সম্পূর্ণ পৃথক একটি ধারণা। এ দুটা কথার ইমপ্লিক্যশানের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে।

সাহাবীরা মনে করতেন যে, ঘুমিয়ে গেলে রোজা কায়েম হয়ে যায়। তৎসত্ত্বেও মানবীয় প্রবৃত্তির কারণে তাঁরা স্ত্রীদের সাথে সম্পর্ক করতেন। এরপর তাঁরা অপরাধ প্রবণতায় ভুগতেন। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা কোরআনের আয়াত নাযিল করে জানালেন যে, ফজর পর্যন্ত তাঁদের জন্য অবকাশ আছে। এ ধরনের ভুল বুঝাবুঝি এখনও ব্যাপকভাবে হচ্ছে। কোনো বিষয়ে মনে করা হচ্ছে, ফাইনালি যা করতে বলা হয়েছে সেটিই আমাদের একমাত্র করণীয়। কিন্তু সেটি বাস্তবে করা সম্ভব হচ্ছে না। তাহলে কি করা যায়? আমাদের এখন কি হবে? এহেন জটিল পরিস্থিতিতে সব অদ্ভূদ সমন্বয়, সোজা কথায় গোঁজামিলগুলো দেয়া হয়, বিভিন্ন রকমের প্রান্তিকতা গড়ে উঠে। নমনীয়তার প্রান্তিকতা ও কঠোরতার প্রান্তিকতা। কোনো কোনো বুনিয়াদী বিষয়ে [যেমন শাসন-কর্তৃত্ব সম্পর্কিত] নমনীয়তা ও আপসকামীতার নীতি অবলম্বন করা হয়। অথচ কোনো কোনো অ-বুনিয়াদী বিষয়ে [যেমন পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি] পূর্ণতার দাবি ও কঠোরতা অবলম্বন করা হয়। এসবই অনাকাংখিত প্রান্তিকতার লক্ষণ।

এই তালগোলে ব্যাপারের পুরোটাই ঘটছে conceptual ambiguity and inconsistency-র কারণে। যদি মনে করা হয় যে আজকের দিনের মধ্যে আমাদেরকে ১০০ মাইল হেঁটে যেতে হবে যা আদৌ আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তখন আমরা কি করব? হতাশ হয়ে হাঁটতে হাঁটতে হয়তবা ৫-১০ মাইল হেঁটে বসে পড়বো নতুবা হতাশ হয়ে বসে থাকবো অথবা ভিন্ন কোনো সহজ পথে হাঁটার চেষ্টা করবো। যদি মনে করা হয় যে, এই ১০০ মাইল আমাদের সর্বমোট দূরুত্ব যাতে এই ১০টা মনযিল রয়েছে তাহলে প্রত্যেক যাত্রী সর্বোচ্চ গতিতে অগ্রসর হবে। ধারণা করা যায় যে, সবাই যার যার মতো করে কোনো এক সময় গন্তব্যে পৌঁছবে। এক একটা ব্যক্তির এক এক অবস্থা, এক একটা সমাজের এক এক অবস্থা, এক একটা এলাকার এক এক অবস্থা। বিশ্ব-আদর্শ হিসেবে ইসলাম, মোর স্পেসিফিক্যালি ইসলামী শরীয়াহ এক এক দেশে এক এক ভাবে প্রাধান্য ও প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। ইসলাম প্রতিষ্ঠার এই ক্রমধারা ও বৈচিত্র্যকে নির্ধারণ করতে হবে, বুঝতে ও বোঝাতে হবে, বাস্তবসম্মতভাবে জনসমাজকে আশ্বস্থ করতে হবে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে উঠা বিদ্যমান ধর্মীয় কাঠামোর সাথে এটি বিরোধপূর্ণ হওয়ায় বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করতে হবে।

যদি মনে করা হয় যে রসূল (স) চূড়ান্ত পর্যায়ে আমাদের যেটা আদেশ দিয়েছেন সেটা থেকে তৎপূর্ববর্তী কোনো স্তরে back করার সুযোগ আমাদের নাই তাহলে হযরত আয়েশা (রা)-এর মদ সংক্রান্ত প্রসিদ্ধ হাদীসটির কথা বলতে হয়। তিনি বলেছেন, ‘প্রথম অবতীর্ণ আয়াতেই যদি বলা হতো যে, তোমরা মদ পান করোনা, তাহলে তাঁরা অবশ্যই বলতো যে, আমরা কখনোই মদ্যপান ত্যাগ করবো না।’ – বুখারী, হাদীস নং ৪৭০৭।

আমরা জানি, মোট ৪ ধাপে মদ নিষিদ্ধ করা হয়। সাহাবীদের জন্য যদি ক্রমধারা দরকারী হয়, অন্যদের জন্য তা হবে না কেন? ব্যক্তি গঠনের জন্য ক্রমধারাকে অনুমোদন করা হলে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য সেটি কার্যকর হবে না কেন? অর্গানিক থিওরি অনুসারে ব্যক্তি বিশেষের মত সমাজেরও একটা স্বতন্ত্র সত্ত্বা রয়েছে। তাই না?

সূরা আল আলে ইমরানের ৭নং আয়াত অনুসারে কোরআনের আয়াতসমূহ দুই ধরনের: দ্ব্যর্থহীন ও দ্ব্যর্থবোধক আয়াত। হিদায়াতের জন্য দ্ব্যর্থহীন আয়াতসমূহই যথেষ্ট। সুস্পষ্ট আয়াতগুলোর মধ্যকার বিরোধ নিরসনে প্রচলিত পদ্ধতি হলো নাসেক্ব ও মানসুক্বের ধারণা। এই পদ্ধতি বা ধারণা একদিক থেকে সঠিক আবার অন্যদিক থেকে ভুল। সমাজ গঠনের ধাপ নির্ণয়ে আমাদেরকে অবশ্যই নাযিলের ধারাবাহিকতা অনুসরণ করতে হবে। কোনো অগ্রসর সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আমরা অতিক্রম করে আসা কোনো প্রাথমিক স্তরের বিধি-বিধানকে অনুমোদন করতে পারি না। সংশ্লিষ্ট সমাজ বা রাষ্ট্র যদি তৃতীয় স্তরে থাকে সেখানে দ্বিতীয় স্তরের বিষয়াদি কার্যকর থাকার প্রশ্নই উঠে না। কিন্তু যে সমাজ বা রাষ্ট্র বা জনপদ এখনো প্রাথমিক স্তর হতে উত্তরণ লাভ করতে পারে নাই সেখানে নাসেক্ব-মানসুক্বের কথা বলে অ-প্রযোজ্য উচ্চতর বা সর্বো্চ্চ ধাপ বাস্তবায়নের চেষ্টা করা ঘোড়ার আগে গাড়ী জুড়ে দেওয়ার মতো পণ্ডশ্রম নয় কি?

আমাদের এখানকার ইসলামী সংগঠনগুলো populist! তাঁরা মনে করেন, যদি এই এই বিষয়ে অপ্রচলিত কিন্তু সত্য কথাগুলো প্রকাশ্যে বলা হয় তাহলে মানুষ ভুল বুঝবে। অতএব সত্য কথা বলা যাবেনা! হক এবং হেকমতের মধ্যে যদি সামঞ্জস্যবিধান করা না যায় তাহলে বাস্তবে গিয়ে সব বরবাদ হয়ে যাবে। হকের দিক থেকে হবে একধরনের বরবাদী আর হেকমতের দিক থেকে হবে অন্যধরনের বরবাদী। হক হওয়া আর হক কায়েম হওয়া বা করা- এক জিনিস নয়। আল্লাহর রাসূল (স) জানতেন যে এরা মুনাফিক। তৎসত্ত্বেও তিনি তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেননি। আল্লাহ তাআলা জানেন যে তিনি কি কি বিষয় আরোপ করবেন, কি কি বিষয়কে নিষিদ্ধ করবেন। মানুষের মননশীলতায় ও বিদ্যমান সামাজিক ব্যবস্থায় গ্রহণযোগ্যতা (receptiveness) সৃষ্টি হওয়ার আগ পর্যন্ত কি করা হবে তা তিনি প্রকাশ (নাযিল) করেননি।

হেকমত অবলম্বন না করার পরিণতি হলো চরমপন্থা অবলম্বন করা। ফিতনাকে জিহাদ মনে করা! সবসময়ে হেকমতকে প্রাধান্য দেয়া হলো হীন আপসকামীতা যাকে আমরা apologetic trend বলে থাকি। কোন কোনো শুভাকাঙ্খী আমাকে বলেছেন, আপনি যে কাজ করছেন তাতে ইসলাম এই নাম নেয়ার দরকার কি? যেমন Center for Social & Cultural Studies (CSCS) এর নামে যা কিছু করা হয়েছে তা সবই ইসলাম-এর পক্ষে গেছে। ফোরামের নামের সাথে ইসলামনা লাগানোতে কোনো সমস্যা হয়েছি কি? কথিত এই ক্যাপসুল ফর্মূলাঅনুসরণ করে আমরা অনেক কিছু করতে পারি বটে কিন্তু আমরা যে মুসলিম, ইসলাম যে আমাদের জীবনাদর্শ, অপরাপর জীবনাদর্শগুলোকে যে আমরা বাতিল মনে করি- একে কি আমরা শেষ পর্যন্ত hide করতে পারি? অতি-হেকমতের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, মূল বিষয় [the basic claim] টাকেই negotiate করে ফেলা! রাসূল (স) এ ধরনের কোনো negotiate করেননি বলে তাঁকে জন্মভূমি ছেড়ে হিজরত করতে হয়েছিল!

হক্ব ও হেকমতের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। কিভাবে এটি সম্ভব? আমাদের প্রত্যেকের বিবেক আছে। Our conscience will say that. আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ফাআলহামা-হা ফুজু-রাহা ওয়া তাক্বওয়াহা।

লেখকঃ মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক
সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

পরিচালক, সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র

The word of Shaykhul Azhar about Corona victim

সামর্থ্যবান প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ওয়াজিব তাদের কিছু ব্যয়ভার বহন করা যারা এই রোগে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ক্ষতিগ্রস্থ লকডাউনে ঘরে আটকা পড়ার কারণে হ...